কলকাতার ট্রাম: আধুনিক নগরের এক অবশিষ্ট অবকাঠামো
শেষ বিকালের আলো রাস্তার কালচে রেলের ওপর ধারাভাষ্যের মতো পিছলে যায়; মসৃণ ধাতুর সঙ্গে চাকার ঘর্ষণে যে দীর্ঘশ্বসের ধ্বনি ওঠে, তাতে বোঝা যায় শহর এখনো নিজের ভিতরে লুকিয়ে রেখেছে এক ধীর, আলগা ছন্দ। সেই ছন্দই কলকাতার ট্রাম, ভারতের একমাত্র সক্রিয় ট্রাম নেটওয়ার্ক, যা আধুনিক নগরায়ণের ভিড়ে থেকেও অবশিষ্ট আছে। শহরের মধ্য ও উত্তরাংশে বেশি ঘনীভূত এই নেটওয়ার্ক আজ কয়েকটি রুটে সীমিত হলেও, ট্রাম এখনও ধরে রেখেছে নগরের -স্মৃতি, যেখানে পরিবহনের পাশাপাশি স্থাপত্য, উপকরণ ও সামাজিক জীবনের স্তরগুলো পরস্পরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। বেলগাছিয়া, রাজাবাজার, গড়িয়াহাট, টলিগঞ্জ, কালীগঞ্জ, খিদিরপুর ও পার্ক সার্কাস-এই ডিপোগুলোর ছায়ায়, ১১টি টার্মিনাসকে ছুঁয়ে, ট্রাম নিজেকে প্রতিদিন নতুন করে নামায় শহরের রাস্তায়।
ঐতিহাসিক পটভূমি
কলকাতার ট্রামের ইতিহাস শহরের আধুনিক বোধেরই আরেক ভাষ্য। ১৮৭৩ সালে এখানে প্রথম ঘোড়ায় টানা ট্রাম চালু হয়। সে উদ্যোগ খুব বেশিদিন টেকেনি; অল্প সময়ের মধ্যেই পরিষেবা বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু নগরের দ্রুত বাণিজ্যবৃদ্ধি ও জনসংখ্যার চাপে যে সাশ্রয়ী, নিয়মিত এবং তুলনামূলকভাবে শৃঙ্খলাবদ্ধ এক পরিবহনমাধ্যমের প্রয়োজন ছিল, তা অস্বীকার করার জো ছিল না।
এই প্রয়োজন থেকেই ১৮৮০ সালে লন্ডনে নিবন্ধিত ক্যালকাটা ট্রামওয়েজ কোম্পানি গড়ে ওঠে এবং ট্রাম-পরিষেবা পুনরায় শুরু হয়। ব্রিটিশ শাসনামলে, যখন কলকাতা ভারতের রাজধানী হিসেবে প্রশাসনিক ও আর্থিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রে, তখন ট্রাম কেবল একটি পরিবহন নয়, নগরের অর্গানিক বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মেলানো এক প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামো। রাস্তাঘাটের রূপরেখা, বাজার, অফিসপাড়া, নদীপাড়-সবেতেই ট্রামের নীরব কিন্তু নির্ধারক উপস্থিতি নগরের সঞ্চালনকে ছন্দে বেঁধে দেয়।
তবে প্রকৃত রূপান্তর আসে ১৯০২ সালে। কলকাতায় বৈদ্যুতিক ট্রাম চালু হয়, এশিয়ার প্রথম বৈদ্যুতিক ট্রাম পরিষেবা। ঘোড়া কিংবা স্টিম নির্ভরতার বদলে বিদ্যুৎচালিত সিস্টেম শহরের অভ্যন্তরে গতি, নির্ভরতা ও জনপরিষেবার এক নতুন অধ্যায় রচনা করে। ট্রাম তখন একদিকে শহুরে আধুনিকতার স্বাক্ষর, অন্যদিকে কর্মক্ষেত্র, বাজার ও বসতির মধ্যে সংযোগরেখা।
স্বাধীনতার পরেও ট্রাম সরকারি নিয়ন্ত্রণে থেকে যায়; ১৯৬৭ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকার এই পরিষেবার সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে। প্রশাসনিক মালিকানা বদলালেও ট্রামের সামাজিক ভূমিকায় মূলগত পরিবর্তন আসে ধীরে ধীরে, যখন ব্যক্তিগত গাড়ি, বাস ও পরবর্তী সময়ে মেট্রোর আগমন হয়। অবকাঠামোর চাহিদা বাড়তে বাড়তে একসময় ট্রামকে জায়গা ছাড়তে হয় বহু অগ্রাধিকারকে। তবু স্মৃতি, অভ্যাস আর সাশ্রয়ের যুক্তিতে ট্রাম থেকে যায়, নগরের একটি অবশিষ্ট কিন্তু দৃঢ়স্তর হিসেবে।
স্থাপত্য ও নকশা
ট্রামের স্থাপত্যশাস্ত্র দেখতে গেলে প্রথমেই ধরা পড়ে এর উপকরণে ও গঠনে সময়ের রেখাচিত্র। প্রাথমিক ট্রামগুলো ছিল কাঠের তৈরি; কখনো হরস-ড্রন, কখনো বা স্টিম শক্তিনির্ভর। কাঠের দেহে তখনকার নগর-ছন্দ এবং যাত্রী-চলাচলের রুক্ষতা, পেলবতা – সবকিছুরই ছাপ ছিল। সময়ের দাবি মেনে ১৯৮২ সালে আসে স্টিল বডি ট্রাম : বহিরাবরণে টেকসই, ব্যবহারে অধিক স্থিতিশীল ও নিরাপত্তায় র্নিভরযোগ্য।
কলকাতার ট্রাম সাধারণত দুই বগি বিশিষ্ট। দৈর্ঘ্যে প্রায় ১৭.৫ মিটার ও প্রস্থে ২.১ মিটার, এই সমাহার শহুরে রাস্তার অনুপাতে নিজেকে সামঞ্জস্য করে নিয়েছে। এই পরিমিত আকার ট্রামকে এমন এক উপস্থিতি দেয়, যা আবার জবরদখলকারী নয়; বরং সহাবস্থানের। দুই বগির গাঠনিক বিন্যাস, ভারবহন ও বাঁক-নেওয়ার ক্ষমতা শহরের বক্রতা ও সরু-প্রশস্ত রাস্তায় চলাচলকে বাস্তবসম্মত করে।
চালনায় ট্রাম নির্ভর করে ৫৫০ ভোল্ট ডিসি বিদ্যুতের ওপর। শক্তি-নিষ্পত্তির এই কাঠামো ট্রামের প্রতিটি অংশে-চাকা, ব্রেকিং, গতি-নিয়ন্ত্রণ-একটি নির্দিষ্ট শৃঙ্খলা তৈরি করে। বাহ্যিকভাবে যে নিস্তরঙ্গ চলাচল দেখা যায়, তার আড়ালে আছে এক নিরবচ্ছিন্ন ইলেকট্রিক্যাল অঙ্গসংস্থান; শহরের ভিতরে নিরাপদ ও নিয়মতান্ত্রিক গতি সুনিশ্চিত করার প্রত্যয় এতে জড়িয়ে থাকে।
ট্রাম-স্থাপত্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ স্তর ডিপো ও ওয়ার্কশপ। বেলগাছিয়া, রাজাবাজার, গড়িয়াহাট, টলিগঞ্জ, কালীগঞ্জ, খিদিরপুর ও পার্ক সার্কাস-এই প্রধান ডিপোগুলো শহরের মধ্যে ছড়িয়ে আছে এমনভাবে, যাতে পরিচালনা, সংরক্ষণ ও মেরামতের কাজগুলো ধারাবাহিকভাবে চলতে পারে। ডিপো ও ওয়ার্কশপগুলোতে কাঠ, স্টিল ও আধুনিক উপকরণ ব্যবহার হয়-এখানে পুরোনো এবং নতুন প্রযুক্তির সহাবস্থান দেখা যায়। কাঠের পুরোনো জোড়-ধরা, স্টিলের ফ্রেমের দৃঢ়তা, এবং সময়ের সাথে সংযোজিত আধুনিক মেরামত-পদ্ধতি-সব মিলিয়ে ট্রামের দেহকে সচল রাখার এক ন্যূনতম পরিকাঠামো তৈরি করে।
স্থাপত্যের সঙ্গে ইতিহাসকে জনস্মৃতিতে বেঁধে রাখার জন্য ‘স্মারনিকা’ ট্রাম মিউজিয়াম একটি উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ। একটি পুরনো ট্রাম বগিকে রূপান্তরিত করে এখানে স্থাপত্যিক ও ঐতিহাসিক উপকরণ প্রদর্শন করা হয়। একটি চলমান জনপরিষেবা-যানকে যখন প্রদর্শনীর কাঠামোয় নিয়ে আসা হয়, তখন সেই বস্তুটি শুধু নস্টালজিক স্মারক থাকে না; থাকে শহরের ব্যবহারিক নকশার বোধ ও প্রযুক্তিগত রূপান্তরের দলিল হিসেবে। পুরনো বগির কুঠুরি, বডির উপকরণ, চাকার সন্নিবেশ-সব মিলিয়ে ‘স্মারনিকা’ দেখায়, কীভাবে একটি প্রযুক্তিস্থাপনা একসঙ্গে নান্দনিক, কার্যকর এবং স্মৃতি-বহনকারী হতে পারে।
ট্রামের রেলপথ শহরের রাস্তায় সন্নিবিষ্ট-এই শহুরে সমন্বয়ও এক ধরনের নকশা-ভাবনা। রাস্তাঘাটের ধারাবাহিকতাকে অবরুদ্ধ না করে বরং সমান্তরাল ও কখনো ছেদকারী রেখায় ট্রাম চলাচল করে; শহরের বহুস্তরীয় গতিকে এক ছন্দে আনে। যেখানে নেটওয়ার্কের ঘনত্ব বেশি, বিশেষত মধ্য ও উত্তরে কলকাতায়, সেই নগর-বস্ত্রে ট্রামের রেখাচিত্র দৃশ্যত স্পষ্ট। এইসব রেখাই ট্রামের উপস্থিতিকে কেবল রাস্তার উপকরণে সীমাবদ্ধ রাখে না; বরং এক স্থায়ী বস্তুতন্ত্রে পরিণত করে।
ব্যবহার, স্মৃতি ও সামাজিক জীবন
প্রথম যুগে ট্রাম ব্যবহার হত পণ্য পরিবহন ও যাত্রী চলাচলের জন্য, অর্থাৎ নগরের দৈনন্দিন প্রয়োজনে এর সরাসরি ব্যবহারিকতা ছিল অনস্বীকার্য। সময়ের স্রোতে যখন ব্যক্তিগত গাড়ি, বাস ও পরে মেট্রো শহরের চিত্র পাল্টাতে শুরু করে, তখন একই প্রয়োজন মেটাতে নানা বিকল্প সামনে আসে। স্বাভাবিকভাবেই ট্রামের ওপর নির্ভরতা কমে আসে, এবং যে বহুরৈখিক নেটওয়ার্ক একসময় ১৯৭০-এর দশকে ৫২টি রুটে বিস্তৃত ছিল, তা সংকুচিত হয়ে আজমাত্র দুইটি রুটে-এসপ্লানেড থেকে শ্যামবাজার ও এসপ্লানেড থেকে গড়িয়াহাট-নিয়ন্ত্রিত পরিসরে নিজেকে ধরে রেখেছে।
এই সংকোচনের পেছনে আধুনিকায়নের অভাব বড় কারণ। যন্ত্রাংশ বদল, বগির সংস্কার, ট্র্যাকের শোধন-এসব প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণ যদি ধারাবাহিকভাবে না হয়, তবে পরিষেবার গতি ও গুণমান দুই-ই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তা সত্ত্বেও, শহরের নিম্ন ও মধ্যবিত্ত নাগরিকদের জন্য ট্রাম এখনো সাশ্রয়ী, আরামদায়ক ও নিরাপদ বলে বিবেচিত। দ্রুততার বদলে একটি স্থিরতা-একটি নির্ভরতার বোধ-যা ট্রামে চেপে শহর পেরোনোর সময় অনুভূত হয়, তা হয়তো এই পছন্দেরই মূলে।
ট্রামের সামাজিক স্মৃতি গড়ে ওঠে প্রতিদিনকার ব্যবহার, প্রতীক্ষা, উঠানামার রুটিন থেকে। অফিসপাড়ায় দিনের শুরুতে ট্রামের নিজস্ব ছায়া; স্কুল-কলেজ-পড়ুয়া বা প্রবীণ যাত্রীর নৈমিত্তিক উপস্থিতি; শহরের কেন্দ্রে কোথাও ট্রামের ধীর গতি-এসব মিলিয়ে এক ধরনের সমবায়িত শহরজীবন। এই সমবায়িকতা কেবল যাত্রীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; ট্রাম কর্মীদের মধ্যেও আছে পরস্পর সহাবস্থানের ঐতিহ্য-ধর্ম ও সম্প্রদায়ের পার্থক্য ভুলে তারা দীর্ঘদিন ধরে কর্মজীবনে সামাজিক ঐক্যের এক নির্লিপ্ত উদাহরণ গড়ে তুলেছেন।
ট্রাম কলকাতার সাংস্কৃতিক পরিচয়েরও দৃঢ় অংশ। শহরের ইতিহাস, চলচ্চিত্র ও সাহিত্যে বারবার ট্রাম উঠে এসেছে এক দৃশ্য-ভাষ্য হিসেবে-কখনো পটভূমি, কখনো সময়ের গতিরূপক। এই সাংস্কৃতিক স্তরকে জিইয়ে রাখতে ‘ট্রামযাত্রা’ উৎসব এবং ‘স্মারনিকা’ মিউজিয়াম গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে চলেছে। উৎসব ট্রামকে জনজীবনের এক খোলা মঞ্চে পুনরায় হাজির করে, যেখানে অতীতের প্রতি সসম্মান, বর্তমানের চাহিদা এবং ভবিষ্যতের সম্ভাবনা এক জায়গায় এসে দাঁড়ায়। আর মিউজিয়াম স্মরণ করিয়ে দেয়, যে জড়বস্তুটি প্রতিদিন রাস্তায় চলে, সেটাই হতে পারে শহরের স্মৃতি সংরক্ষণের এক অকুণ্ঠ মাধ্যম।
অন্যদিকে ব্যবহারের কাঠামোতেও এসেছে রূপান্তর। পণ্যবাহী দিকটি ক্রমশ সরে গিয়ে যাত্রী-পরিষেবাই ট্রামের একমাত্র ভাষ্য হয়ে উঠেছে। কিন্তু সেই ভাষ্যও আজ নিঃশব্দে সংক্ষিপ্ত; রুট কমেছে, ডিপোগুলোর ভেতরকার প্রতিদিনের কর্মতৎপরতায় এসেছে জরাজীর্ণতার ছাপ। তারপরও যারা ট্রামে চড়েন, তাদের সঙ্গে শহরের সম্পর্কটা বিশেষ-সাশ্রয়ের যৌক্তিকতা, নিরাপত্তার যুক্তি, আর একটু সময় নিয়ে শহরকে দেখা – এই তিনে বাঁধা এক দৈনন্দিন সংহতি।
সংরক্ষণ ও সমকালীন অবস্থান
সমকালীন কলকাতায় ট্রামের অবস্থান জটিল। ১৯৭০-এর দশকে যে নেটওয়ার্ক ৫২টি রুটে বিস্তৃত ছিল, তা ক্রমশ কমতে কমতে আজ মাত্র দুই রুটে দাঁড়িয়েছে। আধুনিক যানজট, রাস্তাঘাটের সংকোচন ও মেট্রো সম্প্রসারণ-এই তিনে একত্রে বহু রুট বন্ধ হয়ে গেছে। কিছু ট্রাম ডিপো বাস ডিপোতে রূপান্তরিত হয়েছে, ফলে ট্রামের প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামোর জোগানেও ক্ষয় দেখা দিয়েছে।
রক্ষণাবেক্ষণ ও আধুনিকায়নে দীর্ঘদিনের অবহেলা এর বড় কারণ। ট্রামপথ ও বগির অবস্থা বহু জায়গায় খারাপ; যন্ত্রাংশ ও অবকাঠামো সংস্কারের জন্য পর্যাপ্ত তহবিলের অভাব আছে। এই অবহেলা কেবল চলমান পরিষেবায় নয়, স্মারক সংরক্ষণেও পড়েছে-‘স্মারনিকা’ মিউজিয়ামের বহু ঐতিহাসিক উপকরণ ধুলোমুক্ত ও সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ক্ষয়প্রাপ্ত। কোভিড-১৯ মহামারী ও আমফান ঝড়ের অভিঘাতে রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রম আরও ব্যাহত হয়েছে; অনিয়মিততার মাঝে যে মেরামত প্রয়োজন ছিল, তা স্থায়ীভাবে পিছিয়ে গেছে।
সরকারি উদ্যোগে আধুনিকায়নের জন্য একটি সম্ভাব্যতা সমীক্ষাও করা হয়েছে বলে জানা যায়, তবে বাস্তবায়ন-সংক্রান্ত তথ্য স্পষ্ট নয়। একই সঙ্গে দেখা যাচ্ছে যে বিনিয়োগের অনুপাত বাস ও মেট্রো অবকাঠামোর দিকে বেশি ঝুঁকেছে। ফলে ট্রামের জন্য একটি সমন্বিত রূপান্তর-পরিকল্পনা-যেখানে কাঠামোগত মেরামত, প্রযুক্তি-আপগ্রেড, এবং জনসাধারণের আস্থার পুনর্নিমাণ একত্রে হবে-সেটি এখনও অধরা। নাগরিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর একাংশ ট্রাম সংরক্ষণের পক্ষে আদালত পর্যন্ত লড়াই চালাচ্ছেন; AC ট্রাম চালুর মতো পদক্ষেপও দেখা গেছে, যদিও যাত্রীসংখ্যা সেখানে কম।
এই প্রেক্ষাপটে কয়েকটি প্রশ্ন খোলা রয়ে যায়-আধুনিকায়নের রূপরেখা ও সময়সীমা কতটা নির্দিষ্ট, নেটওয়ার্ক পুনরুদ্ধার বা সম্প্রসারণের সম্ভাবনা কোথায়, অবকাঠামোর বর্তমান অবস্থা ও সংস্কারের স্কেল কতখানি, যাত্রীসংখ্যা ও ব্যবহার সংক্রান্ত সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান কী বলে, স্থানীয় মানুষের মনোভাব কোনদিকে ঝুঁকছে, ‘স্মারনিকা’ মিউজিয়ামের উন্নয়ন-পরিকল্পনা কী, এবং অন্যান্য পরিবহন ব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বয়ে নগরপরিকল্পনায় ট্রামের সুনির্দিষ্ট ভূমিকা কীভাবে নির্ধারণ করা হবে।
তবু এই অনিশ্চয়তার মাঝেও ট্রামের প্রতিদিনকার চলন একটি প্রতীক। আধুনিক নগরে, যেখানে দ্রুততা প্রায়শই একমাত্র গুণ, সেখানে ট্রাম স্মরণ করিয়ে দেয়-গতি মানে কেবল তাড়াহুড়ো নয়; তা হতে পারে স্থিতি, সমতা ও সাশ্রয়ের সমন্বয়। নেটওয়ার্ক আজ সীমিত, তবু যে রুটগুলো সচল-এসপ্লানেড থেকে শ্যামবাজার এবং এসপ্লানেড থেকে গড়িয়াহাট-সেগুলোই বহন করছে এই অবশিষ্ট অবকাঠামোর নাড্ডি।
উপসংহার
কলকাতার ট্রাম একদিকে আধুনিক নগরের প্রথম দিককার স্বপ্নের দলিল-১৮৭৩-এর সূচনা, ১৮৮০-র প্রাতিষ্ঠানিক প্রত্যাবর্তন, ১৯০২-এর বৈদ্যুতিক রূপান্তর-অন্যদিকে আজকের শহরের এক অবশিষ্ট কিন্তু মূল্যবান পরিকাঠামো। উপকরণ ও নকশায় কাঠ থেকে স্টিল, ঘোড়া-স্টিম থেকে ৫৫০ ভোল্ট ডিসি বিদ্যুৎ-এই যে ধাপে ধাপে বিবর্তন, তা কেবল প্রযুক্তি-বদলের কথা বলে না; বলে শহরের জীবনযাত্রার রূপান্তরের কথা। দ্বিগুণ বগির সংযত কাঠামো, ডিপো-ওয়ার্কশপের উপাদানসমূহের সহাবস্থান, ‘স্মারনিকা’র মতো একটি বগিকে স্মৃতির কক্ষে রূপান্তর-এইসব চিহ্ন দেখায়, ট্রামকে বুঝতে গেলে একসঙ্গে ইতিহাস, স্থাপত্য ও সামাজিক জীবনের দিকে তাকাতে হয়।
ব্যবহার কমেছে; নেটওয়ার্ক সঙ্কুচিত। তবু যারা ট্রামে চড়েন, তারা জানেন-এতে আছে এক ধরনের নিরাপত্তা, সাশ্রয় ও সহাবস্থানের অনুভূতি। ট্রাম কর্মীদের পারস্পরিক ঐক্য, নাগরিক সংগঠনগুলোর আগ্রহ, ‘ট্রামযাত্রা’ আর ‘স্মারনিকা’র মতো উদ্যোগ-সব মিলিয়ে ট্রাম এখনও শহরের জীবনরেখায় জেগে আছে। সমকালীনতার চাপে যখন অনেক কিছুই হারিয়ে যায়, তখন এই অবকাঠামো আমাদের শেখায়-কিছু কিছু গতি ধীরে হওয়াই ভালো, কারণ সে গতি শহরের ভিতরে একটি সমতল সময় রেখে যায়; যেখানে আমরা নিজেরাই শহরকে আবার পড়তে পারি। সেই পাঠেই কলকাতার ট্রাম অবিচ্ছেদ্য-একটি চলমান স্থাপত্য, একটি সামাজিক উপমা, এবং আধুনিক নগরের অবশিষ্ট, অথচ অমূল্য বুনট।

