কলকাতার নদীতে বাড়ছে রাসায়নিক দূষণ, স্থানীয়রা উদ্বিগ্ন পরিস্থিতি নিয়ে
দামোদর নদীতে রাসায়নিক দূষণের পরিমাণ বৃদ্ধি
পশ্চিমবঙ্গের দামোদর নদীতে সাম্প্রতিক সময়ে রাসায়নিক দূষণের মাত্রা উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ অনুযায়ী, নদীতে বিভিন্ন শিল্প কারখানার রাসায়নিক পদার্থ মিশ্রিত হচ্ছে, যার ফলে পানির গুণগত মান ব্যাপকভাবে খারাপ হচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গ পরিবেশ দফতরের ২০২৪ সালের মার্চ মাসের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, নদীর বিভিন্ন স্থানে জল নমুনার পরীক্ষা করলে পিএইচ স্তর ও ভারী ধাতুর উপস্থিতি নির্ধারিত সীমার বাইরে পাওয়া গিয়েছে।
সরকারি পরিসংখ্যান ও পরিবেশ দফতরের প্রতিক্রিয়া
পশ্চিমবঙ্গ পরিবেশ দফতরের এক আধিকারিক জানান, দামোদর নদীর জল নমুনায় ক্রমবর্ধমান পারদ ও ক্যাডমিয়ামের মাত্রা নজরদারি করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছে। ২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৪ সালের প্রথম ত্রৈমাসিকে পারদের মাত্রা প্রায় ১৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। পরিবেশ দফতর ইতিমধ্যেই নদীর চারপাশে অবস্থিত শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর জল নিষ্কাশন প্রক্রিয়া সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ শুরু করেছে। এছাড়া, নদীর দূষণ রোধে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসন ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশনা জারি করা হয়েছে।
স্থানীয়দের উদ্বেগ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি
দামোদর নদীর তীরে বসবাসকারী স্থানীয়রা নদীর পানিতে রাসায়নিকের উপস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন। অনেকেই নদীর জল ব্যবহার করে কৃষিকাজ ও গৃহস্থালির কাজ করলেও বর্তমানে তাদের মধ্যে নানা ধরনের স্বাস্থ্য সমস্যা যেমন চর্মরোগ, পেটের অসুখ এবং শ্বাসকষ্টের ঘটনা বাড়তে শুরু করেছে বলে স্থানীয় স্বাস্থ্য কেন্দ্রের রিপোর্টে দেখা গেছে। পশ্চিমবঙ্গ স্বাস্থ্য দফতরের ২০২৩ সালের ডিসেম্বরের একটি জরিপে, নদীর তীরবর্তী এলাকার ৩৫ শতাংশ মানুষের মধ্যে জলবাহিত রোগের লক্ষণ পাওয়া গেছে, যা পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় ১০ শতাংশ বেশি।
আইনি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ
পশ্চিমবঙ্গ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৭০-এর ধারা ৩৯ অনুযায়ী, নদী দূষণ রোধে শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও পর্যবেক্ষণ অপরিহার্য। বর্তমানে রাজ্য পরিবেশ দফতর ও পশ্চিমবঙ্গ দূষণ নিয়ন্ত্রণ বোর্ড যৌথভাবে নদীর পানি পরীক্ষা এবং দূষণকারী কারখানাগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ শুরু করেছে। এছাড়া, গত ফেব্রুয়ারি মাসে নদীর দূষণ নিয়ন্ত্রণে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে, যা প্রতি মাসে নদীর পানি বিশ্লেষণ করে রিপোর্ট জমা দেবে। এই কমিটির রিপোর্ট অনুযায়ী, দূষণের মাত্রা যদি নির্ধারিত সীমার বাইরে পাওয়া যায় তবে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা ও উৎপাদন বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হবে।
পরবর্তী পদক্ষেপ ও নাগরিক অংশগ্রহণ
স্থানীয় প্রশাসন ও পরিবেশ দফতর আরও কঠোর নজরদারি ও সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। নদীর পাড়ে নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা অভিযান, শিল্প কারখানার জল নিষ্কাশন প্রক্রিয়ার উন্নয়ন এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য কর্মশালা আয়োজন করা হচ্ছে। পাশাপাশি, নাগরিকদেরও নদীর দূষণ রোধে সক্রিয় ভূমিকা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। পরিবেশ সংরক্ষণে সবাই মিলে কাজ করলে নদীর স্বাভাবিক সৌন্দর্য ও পরিবেশ রক্ষা করা সম্ভব হবে বলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আশা করছে।
সূত্র: Ei Samay


