শোভাবাজার রাজবাড়ি: ঔপনিবেশিক স্থাপত্যে রাজা নবকৃষ্ণ দেব ও কলকাতার দুর্গাপূজার ঐতিহ্য
shobhabajar rajbari

শোভাবাজার রাজবাড়ি: ঔপনিবেশিক স্থাপত্যে রাজা নবকৃষ্ণ দেব ও কলকাতার দুর্গাপূজার ঐতিহ্য

কলকাতার উত্তর অংশে পুরনো শহরের যে সাংস্কৃতিক ভুবন বহু স্তরে গড়ে উঠেছে, শোভাবাজার রাজবাড়ি তার এক স্বাক্ষরচিহ্ন। ঔপনিবেশিক যুগে বাঙালি জমিদার সমাজের সামাজিক কেন্দ্রবিন্দু, শিল্পরুচি ও আচার-অনুষ্ঠানের মেলবন্ধনের একটি জীবন্ত দলিল এই রাজবাড়ি। রাজা নবকৃষ্ণ দেবের প্রতিষ্ঠিত প্রাসাদসমূহ আজ ৩৩ ও ৩৬ নবকৃষ্ণ স্ট্রিট জুড়ে দাঁড়িয়ে আছে, যেন শহরের স্মৃতিসূত্র ধরে রাখার নীরব স্থপতি। দুর্গাপূজার আয়োজনে এই জায়গাটি যে উত্তর কলকাতার সম্মিলিত স্মৃতি ও পরিচয়ের অংশ হয়ে উঠেছে, তার প্রমাণ মিলেছে বহু প্রজন্মের চর্চা ও অংশগ্রহণে। শোভাবাজার রাজবাড়ি তাই কেবল ইট-চুন-গাথুনির কাঠামো নয়; এটি একসাথে স্থাপত্য, আচার, এবং নগরজীবনের ধারাবাহিকতার পরিমিত রূপক, যেখানে রাজদরবারের আভিজাত্য, ইউরোপীয় নকশা-প্রভাব ও বাঙালি গৃহস্থালির আঙিনাভিত্তিক জীবন এক সুতোয় গাঁথা।

An old photograph of Maa Durga at Sovabazar Rajbari, Kolkata
শোভাবাজার রাজবাড়ি: ঔপনিবেশিক স্থাপত্যে রাজা নবকৃষ্ণ দেব ও কলকাতার দুর্গাপূজার ঐতিহ্য — An old photograph of Maa Durga at Sovabazar Rajbari, Kolkata

ঐতিহাসিক পটভূমি

শোভাবাজার রাজবাড়ির নির্মাণের সূত্রপাত ১৭৫০-এর দশকে। এ সময় কলকাতা শহর ঔপনিবেশিক প্রেক্ষাপটে দ্রুত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, এবং নবগঠিত শক্তির ভারসাম্যে স্থানীয় প্রভাবশালীদের ভূমিকা ক্রমে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছিল। সেই প্রেক্ষাপটে রাজা নবকৃষ্ণ দেব এই জমিদার বাড়ির ভিত্তি স্থাপন করেন, যা পরবর্তী কয়েক দশকে উত্তর কলকাতার সাংস্কৃতিক ও সামাজিক কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। নির্মাণকাজ টানা এক সময়ে সম্পূর্ণ না হয়ে প্রায় সাত দশকের বিস্তারে এগিয়েছে, এবং ১৮৩০-এর দশকে এর পরিসমাপ্তি ঘটে। দীর্ঘ নির্মাণকালই জানিয়ে দেয় যে, প্রাসাদের পরিসর যেমন ব্যাপক, তেমনি এর নকশা ও ব্যবহারে সময়ের রুচি ও প্রয়োজন বারবার ছাপ ফেলেছে।

DurgaPuja2016 Sovabazar Rajbari 02
শোভাবাজার রাজবাড়ি: ঔপনিবেশিক স্থাপত্যে রাজা নবকৃষ্ণ দেব ও কলকাতার দুর্গাপূজার ঐতিহ্য — DurgaPuja2016 Sovabazar Rajbari 02

১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধের পর ব্রিটিশ বিজয়ের পরিপ্রেক্ষিতে নবকৃষ্ণ দেব এই রাজবাড়িতে দুর্গাপূজার আয়োজন করেন। সামাজিক ও আচারিক এই পদক্ষেপ কেবল গৃহস্থ পূজার পরিধিকেই বৃহৎ করেনি; বরং জমিদারী ঐশ্বর্য, আমন্ত্রণ-আড্ডা ও আনুষ্ঠানিক আতিথেয়তার মধ্য দিয়ে এক নতুন নাগরিক আচারপদ্ধতিরও সূচনা করেছে। ঐতিহাসিক তথ্যে নবকৃষ্ণ দেবকে ব্রিটিশদের সহযোগী ও রাজনৈতিক মধ্যস্থতাকারী হিসেবে দেখা হয়, এবং সিরাজ উদ্দৌলার পতনে তাঁর ভূমিকা প্রসঙ্গে আলোচনা রয়েছে। এ বিষয়টি ইতিহাসে বিতর্কিত এবং নানা ব্যাখ্যার জন্ম দিয়েছে; তবু যে সত্যটি স্পষ্ট, তা হলো ব্রিটিশ শাসনের সূচনালগ্নে এই রাজবাড়ি বাঙালি জমিদার সমাজের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রাধান্যের প্রতীকে পরিণত হয়েছিল।

Durjapuja at Shovabazar Rajbari
শোভাবাজার রাজবাড়ি: ঔপনিবেশিক স্থাপত্যে রাজা নবকৃষ্ণ দেব ও কলকাতার দুর্গাপূজার ঐতিহ্য — Durjapuja at Shovabazar Rajbari

শোভাবাজার রাজবাড়িকে ঘিরে তখনকার ইউরোপীয় ও দেশীয় ক্ষমতাকাঠামোর এক নৈকট্যের পরিবেশ দেখা দেয়। এখানে লর্ড ক্লাইভ ও ওয়ারেন হেস্টিংসের মতো ব্রিটিশ শাসকের পদচিহ্ন মিলেছে বলে প্রচলিত তথ্য রয়েছে, যা অতিথি-আচার ও সংস্কৃতির সেতুবন্ধনকে আরেকবার স্পষ্ট করে। পরবর্তী সময়ে এই রাজবাড়ি বহু নাগরিক অনুষ্ঠানের আঙ্গিক গঠনে প্রেরণা জুগিয়েছে। স্বামী বিবেকানন্দের শিকাগো ধর্মসভা থেকে প্রত্যাবর্তনের পর প্রথম নাগরিক সংবর্ধনা যে এখানে আয়োজিত হয়েছিল—এই তথ্যও রাজবাড়ির স্মৃতিময় প্রাঙ্গণের এক উল্লেখযোগ্য অধ্যায় হয়ে আছে।

Lal Mandir in Shovabazar
শোভাবাজার রাজবাড়ি: ঔপনিবেশিক স্থাপত্যে রাজা নবকৃষ্ণ দেব ও কলকাতার দুর্গাপূজার ঐতিহ্য — Lal Mandir in Shovabazar

আজ এই ঐতিহাসিক জমিদার বাড়িটি দুই প্রাসাদ-পরিসরে—৩৩ ও ৩৬ নবকৃষ্ণ স্ট্রিটে—বিস্তৃত। নির্মাণ-ইতিহাসের সূক্ষ্মতম স্তরগুলি নিয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে বটে; তথাপি নিশ্চিত যে, উত্তর কলকাতার নগরস্মৃতি, আচার-অনুষ্ঠান এবং সামাজিক সম্মিলনের প্রাচীন ধারায় শোভাবাজার রাজবাড়ি এক অনিবার্য সম্বল।

Shovabarzar Rajbari inside
শোভাবাজার রাজবাড়ি: ঔপনিবেশিক স্থাপত্যে রাজা নবকৃষ্ণ দেব ও কলকাতার দুর্গাপূজার ঐতিহ্য — Shovabarzar Rajbari inside

আর্কিটেকচার এবং ডিজাইন

শোভাবাজার রাজবাড়ির স্থাপত্যে বাঙালি জমিদার বাড়ির ঐতিহ্যবাহী রূপরেখা অনিবার্যভাবে ধরা পড়ে; সেই সঙ্গে মুঘল ও ইউরোপীয় প্রভাবের সংযোজন কাঠামোকে করে তুলেছে পরিমিত ও প্রতাপশালী। এই প্রাসাদের হৃদয়স্থলে রয়েছে বড় একটি কেন্দ্রীয় উঠোন—থাকুরদালান—যেখানে দুর্গাপূজা ও প্রধান সামাজিক অনুষ্ঠানাদি অনুষ্ঠিত হয়। আকাশমুখী খোলা চত্বরটি ঘিরে রয়েছে দ্বৈত-তলার বারান্দা, যার প্রত্যেক স্তরে বহু-ফোলে আর্চ ও টাস্কান কলামের পরপর বিন্যাস এক ধরনের ছন্দময়তা তৈরি করে। আলো-বাতাস ও সমবেত দর্শনের সুবিধার্থে এই পরিকল্পনা জমিদার বাড়ির আচারিক স্থানের দর্শনরীতি ও নন্দনতত্ত্বকে এক বিন্দুতে আনে।

Shovabazar Rajbari Old Photo 1830
শোভাবাজার রাজবাড়ি: ঔপনিবেশিক স্থাপত্যে রাজা নবকৃষ্ণ দেব ও কলকাতার দুর্গাপূজার ঐতিহ্য — Shovabazar Rajbari Old Photo 1830

থাকুরদালানের চারপাশে তৈরি বারান্দাগুলি উল্লম্বতা ও অনুভূমিকতার ভারসাম্য রক্ষা করে। বহু-ফোলে আর্চগুলির বাঁকানো প্রোফাইল আর টাস্কান কলামের সরল ও কড়া অনমনীয়তা—দুইয়ের সমাবেশে এখানে জন্ম নেয় এক মধ্যস্থিত স্থাপত্যভাষা। এই অভিব্যক্তি না পুরোপুরি ইউরোপীয়, না পুরোপুরি দেশজ মুঘল; বরং দুই ধারার মিতালি, যা ঔপনিবেশিক যুগে কলকাতার স্থাপত্যসৌন্দর্যের এক সুনির্দিষ্ট ছাপ।

Sovabazar Rajbari Durga Pratima
শোভাবাজার রাজবাড়ি: ঔপনিবেশিক স্থাপত্যে রাজা নবকৃষ্ণ দেব ও কলকাতার দুর্গাপূজার ঐতিহ্য — Sovabazar Rajbari Durga Pratima

রাজবাড়ির প্রবেশপথটি সিংহদ্বার নামে পরিচিত। প্রবেশদ্বারে শোভিত সিংহমূর্তি অভ্যাগতদের সামনে যে ভাবগম্ভীরতার রেখা টেনে দেয়, তা কেবল প্রতীকি নয়; বরং রাজকীয় পরিসরে প্রবেশের এক রীতিনির্দিষ্ট সূচনা। এই প্রান্তরেখা অতিক্রম করে দর্শক যখন উঠোনে পৌঁছান, তখন ঘিরে থাকা কলাম-আর্চ-বারান্দার উত্তরোত্তর পুনরাবৃত্তি একটি আনুষ্ঠানিক ছন্দ তৈরি করে, যা পূজার দিনগুলিতে সামাজিক জমায়েতের ধাপগুলিকেও সহজাতভাবে ধারণ করে।

Sovabazar Rajbari Durjapuja
শোভাবাজার রাজবাড়ি: ঔপনিবেশিক স্থাপত্যে রাজা নবকৃষ্ণ দেব ও কলকাতার দুর্গাপূজার ঐতিহ্য — Sovabazar Rajbari Durjapuja

শোভাবাজার রাজবাড়িতে নাচঘর ছিল সাংস্কৃতিক আসর ও বিনোদনের এক বিশেষায়িত স্থান। এ ঘরে সংগীত ও নৃত্যানুষ্ঠানের আয়োজন রাজদরবারি সংস্কৃতির স্মরণীয় দিকচিহ্ন হয়ে আছে। তবে সময়ের ক্ষয়ে আজ নাচঘরের ছাদ ধসে গেছে—অর্থাৎ, কাঠামোর ঐ অংশটি ধ্বংসপ্রাপ্ত অবস্থায় রয়েছে। এ তথ্য আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে ঐতিহ্য কেবল স্মৃতিস্তম্ভীয় নয়; তার সংরক্ষণও সমান জরুরি।

Sovabazar Rajbari Kolkata (2026)
শোভাবাজার রাজবাড়ি: ঔপনিবেশিক স্থাপত্যে রাজা নবকৃষ্ণ দেব ও কলকাতার দুর্গাপূজার ঐতিহ্য — Sovabazar Rajbari Kolkata (2026)

প্রাসাদের পেছনে অবস্থিত নবরত্ন মন্দির পরিবার-দেবতা রাধা গোবিন্দের উপাসনার স্থান। দুর্গাপূজার বাইরেও গৃহদেবতার মন্দির রাজবাড়ির আচারিক জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অক্ষ হিসেবে কাজ করে। নবরত্ন শীর্ষভঙ্গির উপস্থিতি একদিকে যেমন ধর্মীয় স্তম্ভায়নকে দৃশ্যমান করে, তেমনি প্রাসাদের মূল উঠোন ও মন্দিরের পারস্পরিক সম্পর্ক প্রাঙ্গণভিত্তিক ঐতিহ্যকে সুদৃঢ় করে। এই পরস্পর সংযুক্ত পরিসর—প্রবেশদ্বার, উঠোন, বারান্দা ও মন্দির—মিলে গড়ে ওঠে এক অন্তর্গত প্রতিবেশ, যেখানে স্থাপত্য নকশা ও সংস্কারচর্চা একে অন্যকে ব্যাখ্যা করে।

Sovabazar Rajbari
শোভাবাজার রাজবাড়ি: ঔপনিবেশিক স্থাপত্যে রাজা নবকৃষ্ণ দেব ও কলকাতার দুর্গাপূজার ঐতিহ্য — Sovabazar Rajbari

শোভাবাজার রাজবাড়ির দুই পরিসর—৩৩ ও ৩৬ নবকৃষ্ণ স্ট্রিট—একই ঐতিহ্যের ধারক হলেও স্থাপত্য-ব্যবহার ও রক্ষণাবেক্ষণে সময়ের ছাপ আলাদা করে চোখে পড়ে। বহু অংশে আজ অবনতি লক্ষ্য করা যায়; বিশেষত নাচঘরের ছাদ ধসের মতো দৃষ্টিগোচর ক্ষয় আমাদের সামনে ক্ষয়-সংস্কারের প্রশ্ন তোলে। নাগরিক উদ্যোগ ও বিভিন্ন সংস্থা, যেমন ক্যালকাটা হেরিটেজ কালেক্টিভ (CHC), এই রাজবাড়ি ও আশেপাশের ঐতিহাসিক স্থাপত্য সংরক্ষণে কাজ করছে—এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ন্যূনতম দায়বদ্ধতার স্বীকৃতি। সরকার ও বেসরকারি সংস্থার সহযোগিতায় ভবিষ্যতে পুনরুদ্ধারের পরিকল্পনা রয়েছে এবং অর্থায়ন ও নীতিগত সহায়তার মাধ্যমে সংরক্ষণ প্রচেষ্টাকে আরও সুসংহত করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হচ্ছে।

shobhabajar rajbari photo
শোভাবাজার রাজবাড়ি: ঔপনিবেশিক স্থাপত্যে রাজা নবকৃষ্ণ দেব ও কলকাতার দুর্গাপূজার ঐতিহ্য — shobhabajar rajbari photo

অতএব, শোভাবাজার রাজবাড়ির স্থাপত্য কেবল অতীতের ঐশ্বর্য ও ক্ষমতার কাহিনি বলে না; বরং সময়ের সঙ্গে অভিযোজিত এক পরিসর, যেখানে উৎসব, উপাসনা ও সামাজিক সৌজন্যের রীতিগুলি স্থাপত্যের অঙ্গস্বরূপ হয়ে উঠেছে। এই জৈবিক সম্পর্কটিই এর মূল আকর্ষণ—যেখানে বস্তু, আচার ও স্মৃতি এক অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা।

shobhabajar rajbari
শোভাবাজার রাজবাড়ি: ঔপনিবেশিক স্থাপত্যে রাজা নবকৃষ্ণ দেব ও কলকাতার দুর্গাপূজার ঐতিহ্য — shobhabajar rajbari

সাধরন মানুষ এবং স্থানীয় জীবন

শোভাবাজার রাজবাড়ি কলকাতার প্রথম বড় আকারের জমিদারী দুর্গাপূজার কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত, এবং এই আয়োজন পরবর্তীকালে শহরের আরও বহু জমিদারবাড়ির পূজার জন্য আদর্শ বা মডেল হিসেবে বিবেচিত হয়। জমিদারদের এই বৃহদায়তন উৎসব আয়োজনের মধ্যে দিয়ে যে সামাজিক উন্মুক্ততা, আতিথেয়তা ও অভিজাত আচাররীতির সম্মিলন ঘটেছিল, তা ধীরে ধীরে নাগরিক জীবনের উৎসব-ভাষাকেও প্রভাবিত করেছে। পূজার দিনগুলিতে ধুনুচি নাচ, সিন্দুর খেলার মতো ঐতিহ্যবাহী অনুষ্ঠান এই উঠোনেই প্রজন্মান্তরে পুনরাবৃত্ত হয়, আর সেই পুনরাবৃত্তিই শহুরে বাঙালির উৎসবস্মৃতিকে স্থায়ী রূপ দেয়।

ঔপনিবেশিক আমলে ব্রিটিশ শাসকদের আমন্ত্রিত উপস্থিতি—যেমন লর্ড ক্লাইভ ও ওয়ারেন হেস্টিংসের আগমন—এক অনন্য সামাজিক-সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনের উপাখ্যান তুলে ধরে। রাজবাড়ির বৈঠকখানা থেকে উঠোন, আবার সিংহদ্বার হয়ে জনপথ—এই চলাচলের ভাসানবন্দর দিয়ে যে সাংস্কৃতিক লেনদেন তৈরি হয়, তা ছিল একাধারে আচারিক এবং জনসমাগমের রীতিনির্দিষ্ট রূপায়ণ। এই আবহেই শোভাবাজার রাজবাড়ি রাজনীতির পরিধি ছাড়িয়ে জনজীবনের অংশ হয়ে ওঠে, যেখানে আমন্ত্রণ, আড্ডা, শিল্পচর্চা ও আনুষ্ঠানিকতা মিলেমিশে অভিজাত অথচ সামাজিক বাস্তবতার সাথে সংলাপরত একটি মঞ্চ তৈরি করে।

সময়ের প্রবাহে এই রাজবাড়ি শুধু উৎসব নয়, স্মৃতি ও নাগরিক গৌরবের পরিকাঠামোও গড়ে তুলেছে। স্বামী বিবেকানন্দের শিকাগো ধর্মসভা থেকে প্রত্যাবর্তনের পর এখানে যে প্রথম নাগরিক সংবর্ধনা আয়োজন করা হয়—তা এই প্রাসাদের সাংস্কৃতিক ধারকত্বেরই প্রসারিত পরিচয়। এ ধরনের আয়োজন নাগরিক জীবনে সম্মিলিত স্বীকৃতি ও গৌরববোধের ভাষা তৈরি করে, যা আজও শহরের স্মৃতিতে অমলিন।

আজও রাজবাড়ির উত্তরসূরিরা দুর্গাপূজার আয়োজন অব্যাহত রেখেছেন। এই ধারাবাহিকতা কেবল পরিবারের নয়; উত্তর কলকাতার প্রতিবেশগত স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক বৃহত্তর ঐতিহ্যেরও স্থায়ীকরণ। পূজার সময়ে জনসমাগম, আরতির ঢাকঢোল, ধূপ-ধুনোর ঘ্রাণ—সব মিলিয়ে যে অভিজ্ঞতা, তা সাধারন মানুষকে বারবার ফিরিয়ে আনে উঠোন-কেন্দ্রিক সামাজিকতার কাছে। একইসঙ্গে, সংগঠন ও রক্ষণাবেক্ষণের দিকটি এখানে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে; কারণ ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা টিকিয়ে রাখতে নিত্যদিনের যত্ন, অর্থায়ন ও পরিকল্পনা অপরিহার্য। নাগরিক উদ্যোগ ও ক্যালকাটা হেরিটেজ কালেক্টিভ (CHC)-এর মতো সংস্থার আগ্রহ এই বোধকে আরও সুস্পষ্ট করে।

তবে ইতিহাস-লব্ধ কিছু তথ্যের ব্যাখ্যা ও বিবর্তন সম্পর্কে আরও অনুসন্ধানের প্রয়োজন রয়ে গেছে—নবকৃষ্ণ দেবের ব্রিটিশ-সম্পর্ক বা দেশদ্রোহিতার অভিযোগ সংক্রান্ত বিতর্ক, দুর্গাপূজার ক্রমবিকাশের সূক্ষ্ম স্তর, কিংবা নাচঘরের ধ্বংসের কারণ—এসব প্রশ্নের নিরপেক্ষ আলোকপাত ঐতিহাসিক বোধকে আরও স্থিত করে তুলবে। বিতর্কে না গিয়ে বলা যায়, শোভাবাজার রাজবাড়ির গরিমা ও স্মৃতি—উৎসব-সংস্কৃতি, স্থাপত্য ও নাগরিক পরিচয়ের সংযোগস্থল—আজও উত্তর কলকাতার নৈমিত্তিক আবহে গভীরভাবে বোনা।

পরিদর্শন / প্রবেশাধিকার তথ্য

শোভাবাজার রাজবাড়ি উত্তর কলকাতার ৩৩ ও ৩৬ নবকৃষ্ণ স্ট্রিটে অবস্থিত, এবং এটি প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত। প্রবেশ মূল্য নেই—অর্থাৎ বিনামূল্যে দর্শন সম্ভব। শোভাবাজার মেট্রো স্টেশন থেকে রাজবাড়িতে পৌঁছনো সহজ; শহরের এই অংশে জনপরিবহনের সুযোগ-সুবিধাও সুবিধাজনক। দুর্গাপূজার সময় দর্শনার্থীর ভিড় তুলনামূলক বেশি থাকে, তাই সে সময়ে ভ্রমণ পরিকল্পনা করলে সময়ের সংরক্ষণ ও ধৈর্যের প্রস্তুতি থাকা উপযোগী। রাজবাড়ির বিভিন্ন অংশ ঘুরে দেখার সুযোগ রয়েছে—বিশেষত থাকুরদালান ও পেছনের নবরত্ন মন্দির। ঐতিহাসিক কাঠামোর মর্যাদা রক্ষায় পরিসর ব্যবহার ও চলাচলে সংযমী থাকা সবসময় কাম্য।

শেষ কথা

শোভাবাজার রাজবাড়ি এমন এক ঐতিহ্যবাহী প্রাসাদ, যেখানে ঔপনিবেশিক স্থাপত্য ও বাঙালি সমাজজীবনের অন্তর্লীন সূত্রগুলি স্পষ্ট হয়। রাজা নবকৃষ্ণ দেবের প্রতিষ্ঠিত এই জমিদার বাড়ি কেবল অতীতের ক্ষমতাসূচক গৌরবচিহ্ন নয়; বরং শহরের উৎসব-সংস্কৃতির এক জীবন্ত আখ্যান। থাকুরদালানের আঙিনায় দুর্গাপূজার ঐতিহ্য, সিংহদ্বারের রাজকীয় ভাষা, নাচঘরের স্মৃতিহ্রাস, এবং নবরত্ন মন্দিরের সংযমী উপস্থিতি—সব মিলিয়ে এটি একটি বহুমাত্রিক স্থাপত্য-জগৎ, যেখানে আচার, স্মৃতি ও নাগরিকতা একসঙ্গে বসবাস করে।

সময়ের ধুলায় রাজবাড়ির কিছু অংশ ক্ষয়ে গেলেও, নাগরিক ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগে সংরক্ষণের যে চেষ্টাগুলি চলেছে, তা আশাব্যঞ্জক। সরকার ও বেসরকারি সংস্থার সহায়তা, নীতিগত সমর্থন ও পরিকল্পিত অর্থায়নে এই ঐতিহ্যিক স্থাপনা ভবিষ্যতের জন্য আরও স্থিতপ্রতিষ্ঠ হতে পারে। পাশাপাশি, যে ঐতিহাসিক প্রশ্নগুলি আজও খোলা—নিরপেক্ষ গবেষণা ও তথ্যসংগ্রহের মধ্য দিয়ে সেগুলির আলোকিত ব্যাখ্যা এই প্রাসাদের সামগ্রিক মূল্যায়নকে আরও সমৃদ্ধ করবে। শেষাবধি, শোভাবাজার রাজবাড়ি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—একটি শহরের প্রাণ তার স্থাপত্যে যেমন বাস করে, তেমনি বাস করে তার আচার-অনুষ্ঠানের সম্মিলিত স্মৃতিতে। এই দুয়ের মেলায়ই কলকাতার উত্তর অংশে শোভাবাজার রাজবাড়ি এক অনিবার্য, এবং চিরনতুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More
articles