চন্দননগর: ফরাসি উপনিবেশের স্থাপত্য ও চাঁদেরনগর
হুগলি নদীর পশ্চিম কূল ঘেঁষে যে শহরটি সময়, স্মৃতি ও স্থাপত্যের ছায়ায় আজও আপন আলোয় ধরা দেয়, তার নাম চন্দননগর। মনে করা হয় হুগলী নদী চন্দননগরে এসে চাঁদের মতো বাঁক নিয়েছে, তাই এই শহরের প্রথম নাম ছিল চাঁদেরনগর। আজও কিছু কিছু জায়গায় এই পুরানো নামটি দেখা যায়। পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলায় অবস্থিত এই ছোট্ট অথচ ঐতিহ্যবাহী শহরটি একসময় ছিল দক্ষিণ এশিয়ায় ফরাসি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মুখ্য বাণিজ্যিক ঘাঁটি। কলকাতার নাগালেই, তবু এক ভিন্ন আবহে চন্দননগর নিজেকে গড়ে তুলেছে অনন্য সাংস্কৃতিক সংমিশ্রণে—ফরাসি শৈলী ও বাঙালি জীবনের মেলবন্ধনে। নদীর ধার ধরে ৭০০ মিটার দীর্ঘ স্ট্র্যান্ড প্রমেনাড, ডুপ্লেইক্স প্যালেস মিউজিয়ামের নিসর্গ, স্যাক্রেড হার্ট চার্চের গথিক সৌন্দর্য, পাটাল বাড়ির অলৌকিক স্থাপত্য, কিংবা ফরাসি সিমেট্রির নীরব ইতিহাস—সব মিলিয়ে এটি এমন এক শহর, যেখানে প্রতিটি মোড়ে শোনা যায় শতাব্দীর গল্প। পর্যটক কিংবা সংস্কৃতি-সন্ধানী পাঠকের কাছে চন্দননগর গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখানে কেবল অতীতের প্রত্নচিহ্ন নয়, বরং জীবন্ত এক নগর-স্মৃতি লালিত হয়—শহরের ভাষা, উৎসব, খাদ্য, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ও সমাজজীবনে। যারা হুগলি নদীর ধারে এক সুশীল, সংযত অথচ সমৃদ্ধ ঐতিহ্যবাহী বাংলার অভিজ্ঞতা খোঁজেন, তাঁদের জন্য চন্দননগর এক আদর্শ গন্তব্য; আবার যারা ঔপনিবেশিক স্থাপত্য ও নগর-ইতিহাসের গভীরতর পাঠ চান, তাঁদের জন্যও এটি দরদভরা উন্মুক্ত পাঠশালা।

ঐতিহাসিক পটভূমি
চন্দননগরের ইতিহাস আঠারো শতকের উপনিবেশিক উপকূলের গল্পের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। ১৬৭৩ সালে ফরাসি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি হুগলি নদীর তীরে বাণিজ্যকেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেয়; তার ফলেই এই স্থানে প্রথম ফরাসি বসতি গড়ে ওঠে। ১৬৮৮ সালে এটি স্থায়ী ফরাসি উপনিবেশে পরিণত হয় এবং পরবর্তী কয়েক দশকে রপ্তানি-বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি হিসেবে খ্যাতি লাভ করে। কাঁচা রেশম, সুতি বস্ত্র, নীল, এবং নৌপথভিত্তিক লেনদেন এই বন্দরের অর্থনৈতিক ভূমিকে দৃঢ় করেছিল।

জোসেফ ফ্রাঁসোয়া ডুপ্লেইক্সের শাসনামল চন্দননগরের ইতিহাসে এক বিশেষ অধ্যায়। আঠারো শতকের প্রথমার্ধে তাঁর পরিকল্পনায় শহরের বাণিজ্য ও প্রশাসনিক কাঠামো সুসংহত হয়। প্রমেনাড, আদালত, প্রশাসনিক ভবন, ও নদীঘাট—সব মিলিয়ে চন্দননগর হয়ে ওঠে ফরাসি ভারতের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র। তবে উপমহাদেশে ইউরোপীয় শক্তিগুলির প্রতিদ্বন্দ্বিতা চন্দননগরের ভাগ্যকে নানা দোলাচলে ফেলেছিল। ১৭৫৭ সালে ব্রিটিশরা সামরিক অভিযান চালিয়ে শহরটি দখল করে নেয়; পরবর্তী সময়ে ইউরোপের কূটনীতি ও চুক্তির প্রেক্ষাপটে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন ওঠানামা ঘটে।

দীর্ঘ টানাপোড়েনের পর ১৮১৬ সালে চন্দননগর আবার ফরাসিদের হাতে ফিরে আসে এবং উনিশ শতক জুড়ে এটি ফরাসি শাসনের অধীনেই ছিল। এই সময়ে শহরটি বাণিজ্যিক দিক থেকে কিছুটা শান্ত হলেও, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও স্থাপত্যে নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ধরে রাখে। ফরাসি ও বাঙালির সংস্পর্শে সাহিত্যচর্চা, সংগীত, এবং নগর-জীবনে এক সংযত নান্দনিকতা দেখা দেয়; সেটি আজও শহরের নানা অলিগলিতে ছায়া ফেলে আছে।

স্বাধীনোত্তর ভারতবর্ষে উপনিবেশিক অধ্যায়ের অবসান ঘটে চন্দননগরের ক্ষেত্রেও। ১৯৫১ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ডি ফ্যাক্টো বা কার্যত ফরাসি শাসন থেকে শহরটি ভারতীয় প্রশাসনের অধীনে আসে; ১৯৫২ সালের ৯ জুন ডি জুরে বা আইনগত স্বীকৃতি সম্পন্ন হয়। অবশেষে ১৯৫৪ সালের ২ অক্টোবর চন্দননগর পশ্চিমবঙ্গে সংযুক্ত হয়। এই ধারাবাহিক ঘটনার ভিতর দিয়ে শহরটি একটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকেন্দ্র থেকে ধীরে ধীরে এক সাংস্কৃতিক-ঐতিহ্যবাহী শহরে পরিণত হয়—যেখানে ইতিহাস কেবল পাঠ্যবইতে নয়, স্থাপত্য আর লোকজ স্মৃতিতেও জড়িয়ে আছে।

সংস্কৃতি ও স্থানীয় জীবন
চন্দননগরের সাংস্কৃতিক নকশা এক অনুপম সংমিশ্রণ। এখানে বাংলা প্রধান ভাষা হলেও হিন্দি, উর্দু, ওড়িয়া, তেলুগু ইত্যাদিও শোনা যায়; পাশাপাশি ফরাসি ভাষা শিক্ষা কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এখনও চালু রয়েছে, যা শহরের ঐতিহাসিক পরিচয়ের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। শিক্ষার প্রসারে শহরের আগ্রহ পুরোনো; ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী উচ্চ শিক্ষিত জনসংখ্যার হার এ অঞ্চলে তুলনামূলকভাবে বেশি। এই সূচকটি বোঝায়, কেন চন্দননগরের অন্দরমহলে সাহিত্যচর্চা, সংগীতের অনুশীলন, এবং নাট্যচর্চা সচল রয়ে গেছে।

ধর্মীয় ও সামাজিক সহাবস্থানের এক নীরব ভাষা শোনা যায় শহরের উৎসবে। জগদ্ধাত্রী পূজা চন্দননগরের পরিচিতি-চিহ্ন; বারোয়ারি রূপে এই উৎসবের উল্লেখ উনিশ শতকের শেষভাগে পাওয়া যায়। শোভাযাত্রা, আলোকসজ্জা, প্রতিমার শিল্পকলা, এবং নদীর ধারের আড্ডা—সব মিলিয়ে শহরের সামাজিক সম্পর্ক আরও নিবিড় হয় এই সময়। একই সঙ্গে ক্রিসমাসের মৌসুমে স্যাক্রেড হার্ট চার্চে প্রার্থনা ও সংগীতানুষ্ঠান, স্থানীয় মসজিদ-মন্দিরের আচার—সবকিছু মিলিয়ে চন্দননগরের সমাজে বহুমাত্রিক সহনশীলতার অনুশীলন লক্ষণীয়।

শহরের খাদ্য-সংস্কৃতি বাংলার ঐতিহ্যকে মান্য করে চললেও ফরাসি প্রভাবের নিঃশব্দ উপস্থিতি রয়েছে। বাঙালি রান্নায় মাছ-ভাতের সহজপ্রিয়তা, মুড়ি-ঘুগনি-টেলেভাজা’র বিকেলের জলখাবার, এবং মিষ্টির দোকানের পুরোনো ভাঁড়–সবই আপন ধারায় আছে। চন্দননগরের জলভরা সন্দেশ স্থানীয়ভাবে বহুচর্চিত; তাজা ছানার শরীরে রসভরা মাধুর্য এই মিষ্টিকে আলাদা করে। এছাড়া কেক-পেস্ট্রির পুরোনো দোকানগুলোয় ইউরোপীয় বেকিংয়ের ছায়া টের পাওয়া যায়, যা শহরের প্রবাসী ফরাসি ঐতিহ্যের স্বাদ মনে করিয়ে দেয়।

স্থাপত্য ও নগররূপে ফরাসি প্রভাব সবচেয়ে অনায়াসে ধরা পড়ে। লম্বা বারান্দা, কাঠের লুভার, খিলান জানালা, স্টুকো অলঙ্করণ—এই সব উপাদান বহু বাড়ি ও জনপরিসরে দেখা যায়। স্ট্র্যান্ড প্রমেনাডে কাস্ট-আইরন ল্যাম্পপোস্ট আর পুরোনো বৃক্ষশোভা সন্ধ্যার আকাশে মিশে যায়; দ্বিভাষিক সাইনেজ, প্রাচীন বিদ্যালয় ও কনভেন্ট, এবং Institut de Chandernagore মিউজিয়াম ও শিক্ষা কেন্দ্র শহরের সাংস্কৃতিক স্মৃতিকে টিকিয়ে রাখে। একই সঙ্গে আধুনিক জীবনের গতি—ই-রিকশা, সাইকেল-রিকশা, ছোট ক্যাফে—এই সবকিছুর সঙ্গে পুরোনো আবহের এক নম্র সমন্বয় গড়ে উঠেছে।

অভিজ্ঞতা ও দর্শনীয় দিক
চন্দননগর দেখার সবচেয়ে স্বাভাবিক উপায় একটি ধীর পায়ে হাঁটা। সকাল বা বিকেল—যখনই হোক, স্ট্র্যান্ড প্রমেনাড ধরে হাঁটতে হাঁটতে যে দৃশ্যপট খুলে যায়, তা একদিকে হুগলি নদীর প্রশান্তি, অন্যদিকে ফরাসি স্থাপত্যের শান্ত সম্ভ্রম। পাতার ছায়ায় ঢাকা পথ, পুরোনো গাছের গোড়ায় ছোট আড্ডা, নদীর ওপরে নৌকার ছায়া—এই সবখানেই শহরের মেজাজ বোঝা যায় সবচেয়ে গভীরভাবে। সন্ধ্যায় নদীর হাওয়ায় বসে কাছের দোকান থেকে হালকা জলখাবার তুলে নিতে নিতে পুরোনো ভবনের দিকে তাকিয়ে থাকা—এ যেন নরম স্বরে ইতিহাস পড়া।

ডুপ্লেইক্স প্যালেস মিউজিয়াম শহরের স্মৃতিধারক। আঠারো শতকের মাঝামাঝি নির্মিত এই প্রাসাদে আজ সংরক্ষিত আছে ফরাসি উপনিবেশিক প্রশাসন, বাণিজ্য, শিল্পচর্চা এবং স্থানীয় সমাজজীবনের নানা নিদর্শন। প্রাচীন মানচিত্র, দলিল, মুদ্রা, ফার্নিচার, আলোকচিত্রী নথি—সব মিলিয়ে এখানকার সংগ্রহ চন্দননগরের অতীতকে নির্ভুলভাবে দেখতে শেখায়। মিউজিয়ামের প্রবেশমূল্য সংযত; ভারতীয় দর্শনার্থীদের জন্য প্রযোজ্য ৫ টাকা এবং বিদেশিদের জন্য ২০ টাকা। সাধারণত সকাল ১১টা থেকে বিকেল ৫টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত খোলা থাকে; সাপ্তাহিক বন্ধের দিন হিসেবে বৃহস্পতিবার ও শনিবার ধরা হয়। প্রদর্শনকক্ষে ফটোগ্রাফি বা স্পর্শ সংক্রান্ত বিধিনিষেধ মানা সবসময়ই জরুরি; সর্বশেষ নিয়ম জানতে প্রবেশপথে জিজ্ঞেস করাই শ্রেয়।

স্যাক্রেড হার্ট চার্চ গথিক স্থাপত্যশৈলীর অনন্য উদাহরণ। ১৮৮৪ সালের ২৭ জানুয়ারি উদ্বোধিত এই গির্জার উঁচু খিলান, রঙিন কাচের জানালায় ধর্মীয় চিত্রকলা, আর সুসংহত ফ্যাসাদ—সব মিলিয়ে এটি নীরব অথচ গভীর প্রভাববিস্তারী। প্রার্থনার সময়ে নীরবতা বজায় রাখা এবং অভ্যন্তরে শালীন পোশাক-আচরণ পালন করা দর্শনার্থীর সৌজন্যের অংশ। বাইরের উঠানে একটু বসে থাকলেই টের পাওয়া যায় কীভাবে সময় এখানে ধীরে বইছে, প্রায় নদীর মতো।

পাটাল বাড়ি শহরের সবচেয়ে কৌতূহলোদ্দীপক স্থাপত্যগুলির একটি। কথা আছে, নদীর জলে নিমজ্জিত নিম্নতলাকে ঘিরেই এই বাড়ির নামের উৎপত্তি—পাটাল, মানে জলের নীচের অংশ। ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীর অভিধানে পাটাল বাড়ির বারান্দা প্রায় নদীর ছোঁয়া পেত; আজ সংরক্ষণ-পর্বের বাস্তবতায় তার ভিন্নতা ঘটেছে। সাহিত্য ও সমাজসংস্কৃতির সঙ্গে এই বাড়ির সম্পর্কও উল্লেখযোগ্য; শহরের স্মৃতিচিত্রে এটি এক বিশেষ মানচিহ্ন।

ফরাসি সিমেট্রি বা সমাধিসৌধ নীরব অথচ বহু কাহিনি-বহনকারী একটি স্থান। এখানে প্রায় ১৫০টি সমাধি রয়েছে—নাম-পদবি, তারিখ, এবং পাথরের অলঙ্করণে ধরা পড়ে ফরাসি উপস্থিতির দীর্ঘস্মৃতি। পরিচ্ছন্নতা ও শালীনতার শর্ত মেনেই এই সমাধিক্ষেত্র ঘুরে দেখা উচিত; পাঠকের জন্য এটি প্রায় এক মুক্ত-আকাশের আর্কাইভ। কাছেই ১৮৮০ সালে নির্মিত ক্লক টাওয়ার শহরের প্রাচীন জনপরিসরের এক চিহ্ন-স্থাপনা; বিকেলের আলোয় দাঁড়িয়ে থাকা এই টাওয়ার আপন ছায়ায় বহু পথিককে আশ্রয় দেয়।

চন্দননগরের উৎসব-অভিজ্ঞতা বলতে প্রথমেই আসে জগদ্ধাত্রী পূজার প্রসঙ্গ। আশ্বিন-কার্তিকের সন্ধিক্ষণে শহর জুড়ে আলোকসজ্জা, প্রতিমার শিল্পনৈপুণ্য, শোভাযাত্রা আর রঙিন স্থাপনার ভিড় তৈরি হয়। স্থানীয় সংস্কৃতি বোঝার জন্য এটি এক অনন্য সময়; তবে ভিড় ও যানজটের বাস্তবতা মাথায় রাখা জরুরি। বছরের বাকি সময়ে শহরটি অনেকটাই শান্ত—যেখানে নদীর ধার, মিউজিয়াম, চার্চ ও পুরোনো বাড়িগুলির সঙ্গে ধীর পরিচয় তৈরির উপযুক্ত অবসর মেলে। স্থানীয় মিষ্টির দোকানে গিয়ে জলভরা সন্দেশ বা ছানার অন্য প্রস্তুতি চেখে দেখা, কিংবা ছোট ক্যাফেতে বসে কফির কাপ হাতে স্ট্র্যান্ডের দিকে তাকিয়ে থাকা—সবই একেকটি নরমস্বর অভিজ্ঞতা।
ভ্রমণ সংক্রান্ত তথ্য
কলকাতা থেকে চন্দননগর পৌঁছানো সহজ ও স্বল্প সময়ে সম্ভব। রেলপথে হাওড়া থেকে লোকাল ট্রেনে চন্দননগর স্টেশন প্রায় ৫০ থেকে ৫৫ মিনিটের মধ্যে পৌঁছে দেয়, ট্রেনের ধরন ও স্টপেজ অনুযায়ী সময় অল্পবিস্তর পরিবর্তিত হতে পারে। সড়কপথে গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড বা দিল্লি রোড ধরে ব্যক্তিগত গাড়ি কিংবা বাসে যাওয়া যায়; যানজটের সময় এড়াতে সকাল বা দুপুর-পরবর্তী সময়ে রওনা হওয়া সুবিধাজনক। জলপথে হুগলি নদীর জেটি সার্ভিস চালু রয়েছে, যা নৌভ্রমণের আলাদা স্বাদ দেয় এবং স্ট্র্যান্ড প্রমেনাডের কাছে নামিয়ে দেয়; নৌ-সেবার সময়সূচি মৌসুমি বা প্রশাসনিক কারণে পরিবর্তিত হতে পারে, তাই আগেভাগে তথ্য জেনে নেওয়া বুদ্ধিমানের। নিকটতম বিমানবন্দর কলকাতার নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর; সেখান থেকে সড়কপথে চন্দননগর প্রায় ৪০ কিলোমিটারের দূরত্বে।
চন্দননগর ভ্রমণের অনুকূল ঋতু সাধারণত অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি। এ সময় আবহাওয়া শুষ্ক ও আরামদায়ক; হাঁটা, ফটোগ্রাফি এবং নদীর ধারে সময় কাটানোর জন্য আদর্শ। মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত গরম ও আর্দ্রতা বেড়ে যায়; তবে সকালের প্রথম ভাগ আর বিকেলের পরের ভাগে আরামদায়ক হাঁটা সম্ভব। বর্ষায় হুগলি নদীর রূপ অতুল্য হলেও অনিয়মিত বৃষ্টি এবং ঘাটে পিচ্ছিলতা মাথায় রেখে চলা জরুরি। উৎসবের সময়ে, বিশেষ করে জগদ্ধাত্রী পূজার সপ্তাহে, প্রচণ্ড ভিড় হওয়ায় আবাসন ও যাতায়াত পরিকল্পনা আগে থেকে সেরে রাখাই ভালো।
শহরের অভ্যন্তরে চলাফেরার জন্য ই-রিকশা, সাইকেল-রিকশা ও হেঁটে চলাই সবচেয়ে সুবিধাজনক। স্ট্র্যান্ড, ডুপ্লেইক্স প্যালেস মিউজিয়াম, স্যাক্রেড হার্ট চার্চ এবং ফরাসি সিমেট্রি—এগুলো একে অপরের কাছাকাছি হওয়ায় অল্প সময়েই পায়ে হেঁটে দেখা যায়। জনপরিসরের সৌজন্য মেনে চলা, ধর্মীয় বা ঐতিহাসিক স্থাপনায় নির্দিষ্ট বিধি মানা, এবং ফটোগ্রাফির ক্ষেত্রে অনুমতি নেওয়া বাঞ্ছনীয়। চার্চ বা মিউজিয়ামের অভ্যন্তরে অনেকসময় ফ্ল্যাশ ফটোগ্রাফি নিষিদ্ধ থাকে; সাইনেজ লক্ষ্য করুন। সমাধিক্ষেত্রে নীরবতা ও শালীন আচরণ বজায় রাখুন।
খাবারদাবারের পরিকল্পনায় স্থানীয় মিষ্টান্ন ও বাঙালি পদ তালিকায় রাখুন; পরিচ্ছন্ন ও জনপ্রিয় দোকান বেছে নেওয়া নিরাপদ। পানীয় জলের ক্ষেত্রে সিল করা বোতল বা নির্ভরযোগ্য উৎস ব্যবহার করা ভালো। গ্রীষ্মকালে টুপি, সানস্ক্রিন, পানির বোতল এবং আরামদায়ক জুতো সঙ্গে রাখুন; বর্ষায় ছাতা বা রেইনকোট অপরিহার্য। বিকেলে স্ট্র্যান্ডে মৃদু হাওয়া খেলায়, তাই সামনের দিকে ক্যামেরা-ল্যাপটপ ইত্যাদি সুরক্ষিত ভাবে রাখা দরকার। নদীর ঘাটে নেমে ছবি তুললে পিচ্ছিলতা ও জোয়ার-ভাটার দিকে নজর রাখুন।
চন্দননগর মিউজিয়ামের সময়সূচি ও প্রবেশমূল্য আগেই যাচাই করে নিলে দিনটি সুবিন্যস্ত করা সহজ হয়। সাধারণ হিসাবে সকাল ১১টা থেকে বিকেল ৫:৩০ পর্যন্ত খোলা থাকে; বৃহস্পতিবার ও শনিবার বন্ধ থাকে বলে ধরা হয়। ছুটির দিন বা বিশেষ কর্মসূচির কারণে পরিবর্তন ঘটতে পারে—সাইটে দেওয়া তথ্য বা স্থানীয় পর্যটন দপ্তরের হালনাগাদ বিজ্ঞপ্তি দেখে নেওয়া ভালো। শহরের নিরাপত্তা ও পর্যটক-সুবিধা সন্তোষজনক; তবু রাতের খুব দেরিতে ফাঁকা রাস্তায় একা চলাফেরা এড়িয়ে চলা বুদ্ধিমানের। স্মারকচিহ্ন হিসেবে পোস্টকার্ড, হস্তশিল্প বা স্থানীয় মিষ্টি সঙ্গে নেওয়া যায়; প্লাস্টিক বর্জ্য এড়িয়ে পরিবেশবান্ধব প্যাকেজিং বেছে নিলে নদীতীর সংরক্ষণে ছোট হলেও একান্ত ভূমিকা রাখা হয়।
উপসংহার
চন্দননগর এমন এক শহর, যেখানে নদী ও নগরের মেলবন্ধন ইতিহাসের সুরে বাঁধা। ফরাসি উপনিবেশের স্থাপত্য, বাঙালি সমাজজীবনের সহজাত উষ্ণতা, উৎসবের ঐতিহ্য, এবং শিক্ষানুরাগ—সব মিলিয়ে এখানে এক নীরব, সুসংহত সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল গড়ে উঠেছে। ডুপ্লেইক্স প্যালেস মিউজিয়ামের কক্ষ থেকে স্যাক্রেড হার্ট চার্চের প্রার্থনারত আলো, পাটাল বাড়ির স্তরে স্তরে লুকোনো কাহিনিরেখা থেকে স্ট্র্যান্ড প্রমেনাডের সূর্যাস্ত—প্রতিটি অভিজ্ঞতা যেন আপনাকে ফিরিয়ে দেয় অতীতের কাছে, আবার বর্তমানের সংবেদনেও রাখে কোমল নিবাস।
যে ভ্রমণ আপনাকে হাঁটতে শেখায়, ধীরে দেখতে শেখায়, আর শ্রদ্ধা নিয়ে সংরক্ষণকে ভাবতে শেখায়—চন্দননগর সেই ভ্রমণের আদর্শ পাঠশালা। এখানে সময়ের মাপ ধরা পড়ে ঘড়িঘরের ঘণ্টাধ্বনিতে, নদীর জোয়ারে, এবং পুরোনো বাড়ির বারান্দায় বসে থাকা বিকেলের আলসে আলোয়। আপনি যদি উপমহাদেশের উপনিবেশ-ঐতিহ্য, নদীকূলের নগর-সংস্কৃতি, ও মানুষের শান্ত অথচ সজীব দিনযাপনের গভীরে যেতে চান, তবে চন্দননগর আপনাকে সাদরে আহ্বান জানায়—নরম স্বরে, নিঃশব্দ সম্মতিতে, দীর্ঘস্থায়ী স্মৃতির প্রতিশ্রুতি দিয়ে।


