ব্রিহদীশ্বর মন্দির, থাঞ্জাভুর: চোলা স্থাপত্য ও অবিশ্বাস্য জ্যামিতির এক মহাগাথা
Aerial View 2 thanjavur Brihadesvara Temple Tanjavur India

ব্রিহদীশ্বর মন্দির, থাঞ্জাভুর: চোলা স্থাপত্য ও অবিশ্বাস্য জ্যামিতির এক মহাগাথা

থাঞ্জাভুরের ব্রিহদীশ্বর মন্দির ভারতীয় উপমহাদেশের মধ্যযুগীয় স্থাপত্যসাধনার এক অসামান্য দলিল, যেখানে চোলা শাসন, শৈব ভক্তি, শিল্প ও প্রকৌশল এক সুসংহত বিন্যাসে মিলিত হয়েছে। কাবেরী নদীর দক্ষিণ তীরে, থাঞ্জাভুর শহরের অন্তঃস্থলে অবস্থিত এই মন্দিরটি কেবল একটি উপাসনাক্ষেত্র নয়, বরং প্রায় এক সহস্রাব্দ ধরে চালু থাকা নৃত্য, সঙ্গীত, ভাস্কর্য, মুরাল ও শিলালিপির বহুমাত্রিক আর্কাইভও বটে। ১০০৩ থেকে ১০১০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে চোলা সম্রাট রাজরাজা চোলা প্রথমের পৃষ্ঠপোষকতায় নির্মিত এবং স্থানীয় ভাষায় থাঞ্জাই পেরিয়া কোভিল নামে পরিচিত এই মন্দির, গঙ্গাইকোন্ডাচোলপুরম ও আইরাভতেশ্বর মন্দিরের সঙ্গে মিলিয়ে ইউনেস্কোর গ্রেট লিভিং চোলা টেম্পলস শিরোনামে বিশ্ব ঐতিহ্যভুক্ত। ব্রিহদীশ্বরের ক্ষেত্রে বিশেষ লক্ষণীয় তার দ্রাবিড়ীয় স্থাপত্যে অবিশ্বাস্য জ্যামিতির ভাষা—দীর্ঘ আয়তাকার প্রাঙ্গণ, পিরামিডীয় ভিমানা, একক গ্রানাইট শিখর-ব্লক, নিখুঁত ইন্টারলকিং ওজন-বণ্টনের নীরব যুক্তিবাদ—যা মিলিয়ে এই মন্দিরকে একই সঙ্গে মহিমান্বিত ও সুস্থিত করে তুলেছে। বিশালাকৃতি লিঙ্গ, একখণ্ড গ্রানাইট থেকে গড়া নন্দিমূর্তি, প্রাঙ্গণজুড়ে বহুজীবন্ত দেবমূর্তি, ৮১টি করণা-ভিত্তিক নৃত্যভাস্কর্য, এবং চোলা থেকে নায়ক যুগ পর্যন্ত বিস্তৃত মুরালচিত্র—সব মিলিয়ে এটি এক জীবন্ত শিল্পকোষ, যেখানে ধর্মীয় ক্রিয়া, সামাজিক সংগঠন ও নন্দনতত্ত্ব এক আখ্যানগুচ্ছে রূপ নিয়েছে। এই নিবন্ধে আমরা মন্দিরটির ইতিহাস, স্থাপত্যবিন্যাস, ভাস্কর্য-শিলালিপি, সাংস্কৃতিক তাৎপর্য ও প্রাসঙ্গিক দর্শন-তথ্য আলোচনার পাশাপাশি চোলীয় কারিগরির মাপ-জোখ ও জ্যামিতিক সংবেদকে অনুসরণ করার একটি বিশ্লেষণ-পথ নির্মাণ করব, যাতে ব্রিহদীশ্বরের শিলায় শিলায় নিহিত ঐতিহাসিক চেতনাকে সমগ্রতায় উপলব্ধি করা যায়।

Aerial Brihadesvara Temple Tanjavur India Thanjavur temple
ব্রিহদীশ্বর মন্দির, থাঞ্জাভুর: চোলা স্থাপত্য ও অবিশ্বাস্য জ্যামিতির এক মহাগাথা — Aerial Brihadesvara Temple Tanjavur India Thanjavur temple

ঐতিহাসিক পটভূমি

ব্রিহদীশ্বর মন্দিরের নির্মাণযজ্ঞ শুরু হয় ১০০৩ খ্রিস্টাব্দে এবং ১০১০ খ্রিস্টাব্দে সমাপ্ত হয়, যখন চোলা সাম্রাজ্য দক্ষিণভারতের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক শক্তির শীর্ষে অবস্থান করছিল। এই সময়ে রাজরাজা চোলা প্রথম কেবল ভূখণ্ড বিস্তারেই নয়, রাজস্বব্যবস্থা, মন্দির-অর্থনীতি ও শিল্প-সংগঠনে দূরদর্শী নীতিনিষ্ঠতার পরিচয় দেন; তারই পরিণাম ব্রিহদীশ্বর—একদিকে শিবভক্তির নিবেদন, অন্যদিকে সাম্রাজ্যের সমৃদ্ধি, স্থিতি ও নিয়মের দৃষ্টান্ত। থাঞ্জাভুর, কাবেরীর দক্ষিণ তীরের কৌশলগত ও কৃষি-সম্পদের কেন্দ্র হিসেবে, এই মন্দিরের জন্য প্রাকৃতিক পটভূমি জুগিয়েছিল; ফলে উপাসনা, শিক্ষা ও শিল্পচর্চার সম্মিলিত কাঠামো গড়ে ওঠে। পরবর্তী শতাব্দীগুলিতে ইতিহাসের ঢেউয়ে এই মন্দির বিভিন্ন শাসনশক্তির সংস্পর্শে আসে—পাণ্ড্য, মদুরাই সুলতানাত, বিজয়নগর, নায়ক ও মারাঠা—যারা তাঁদের নিজস্ব সময়ের প্রয়োজন ও নন্দনতত্ত্ব অনুযায়ী সংস্কার, সংযোজন ও রক্ষণাবেক্ষণ সম্পন্ন করেন। ফলে ব্রিহদীশ্বর কেবল একটি একক সময়ের সৃষ্টি নয়; বরং একাধিক যুগের কারুকার্য, চিত্রকলার স্তরিত অনুক্রম, শিলালিপির ধারাবাহিক নথিভুক্তি ও প্রশাসনিক স্মৃতির অঙ্গীভূত সমাহার। মন্দিরটিকে কেন্দ্র করে উপাসনা, উৎসব, নৃত্য ও সঙ্গীতের প্রাচীন রীতি হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে চলমান রয়েছে, যা ভারতীয় মন্দির-সংস্কৃতির ধারাবাহিকতার এক দুর্লভ দৃষ্টান্ত। ১৯৮৭ সালে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকাভুক্তির মধ্য দিয়ে ব্রিহদীশ্বর মন্দিরের স্থাপত্য-ঐতিহাসিক গুরুত্ব আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করে; পাশাপাশি গঙ্গাইকোন্ডাচোলপুরম ও আইরাভতেশ্বরের সঙ্গে মিলিয়ে চোলীয় স্থাপত্যধারার এক ধারাবাহিক উন্নয়নরেখা চিহ্নিত হয়। স্থানীয়ভাবে থাঞ্জাই পেরিয়া কোভিল নামে পরিচিত এই স্থাপত্যকীর্তি আজও থাঞ্জাভুর শহরের প্রাণকেন্দ্র, যেখানে ঐতিহাসিকতা ও দৈনন্দিনতার সংযোগে মন্দির-প্রাঙ্গণ এক বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক পরিসর রচনা করে চলেছে।

Brihadesvara Temple Tanjavur India Detail
ব্রিহদীশ্বর মন্দির, থাঞ্জাভুর: চোলা স্থাপত্য ও অবিশ্বাস্য জ্যামিতির এক মহাগাথা — Brihadesvara Temple Tanjavur India Detail

স্থাপত্য ও বিন্যাস

ব্রিহদীশ্বরের স্থাপত্য দ্রাবিড়ীয় শৈলীতে নির্ভরশীল, যেখানে অনুপাতের কষাঘাত, স্থিরতা ও স্তরায়িত ভরের প্রাধান্য দেখা যায়। সমগ্র স্থাপত্যটি নির্মিত হয়েছে গ্রানাইট পাথরে; প্রয়োজনীয় পাথর প্রায় ৬০ কিলোমিটার দূরবর্তী খনিজক্ষেত্র থেকে সংগৃহীত হওয়া এই নির্মাণের পরিকল্পনাগত পরিসর ও লজিস্টিক দক্ষতার প্রমাণ বহন করে। মন্দিরের ভিত্তি এক প্রাকৃতিক বা মানবসৃষ্ট টিলার উপর স্থাপিত, ফলে গঠনগত স্থিতি ও উচ্চাভিলাষী ভিমানার ভারবণ্টন সুনিশ্চিত হয়েছে। নির্মাণে মর্টারের ব্যবহার না করে নিখুঁত ইন্টারলকিং পদ্ধতিতে গ্রানাইট-ব্লক বসানো—এই বিশেষ কৌশল স্থাপত্যকে কেবল দীর্ঘস্থায়ীই করেনি, বরং ভূকম্পন-সহন ও ওজন-সম্প্রসারণে স্বতঃস্ফূর্ত লচিলতা দিয়েছে বলে তার যুক্তিবীক্ষণ নকশা অনুমান করতে ইঙ্গিত করে। প্রাঙ্গণের বিস্তার পূর্ব-পশ্চিমে প্রায় ২৪০ মিটার এবং উত্তর-দক্ষিণে প্রায় ১২২ মিটার; এই দীর্ঘায়ত বিন্যাসে মন্দির-অক্ষ, আনুষ্ঠানিক চলনপথ ও দর্শন-পরিসরের ধাপে ধাপে উন্মোচন এক স্বাভাবিক ছন্দে ঘটে। পরিসরের চারদিকে দ্বৈত-তলা মালিকা ও পারিবারালয় থাকায় মন্দির কেবল উপাসনার জায়গা নয়, নৈমিত্তিক দায়িত্ব, অনুশীলন ও আবাসিক প্রয়োজনেরও অবলম্বন হয়ে ওঠে; এই ঘেরাটোপই মন্দির-শহরের অভ্যন্তরীণ সংগঠনের প্রতীক। প্রবেশপথে গোপুরাম ও ছোট ছোট গেটওয়ে স্থাপত্যিকভাবে স্তরায়িত প্রবেশ-অনুভূতি সৃষ্টি করে, যাতে বাইরের জগত থেকে গর্ভগৃহমুখী গতিপথে ভৌতিক ও নান্দনিক রূপান্তর অনুভূত হয়। এই সম্পূর্ণ পরিকল্পনার শিখরে রয়েছে ১৩ তলা বিশিষ্ট পিরামিডাকৃতি ভিমানা, যার উচ্চতা প্রায় ৬৬ মিটার; তলা-তলা ক্রমহ্রাসমান ভরের ছাঁদে যে স্থাপত্য-ছন্দ জন্ম নেয়, তা দূর থেকে দৃষ্টিনন্দন এবং নিকট-দর্শনে দৃঢ়। ভিমানার শিখরে বসানো একক গ্রানাইট-ব্লকটির পরিমাপ প্রায় ৭.৮ মিটার বর্গাকার এবং ওজন প্রায় ৮০ টন—এমন মসৃণভাবে স্থাপিত শিখর-ব্লক সমগ্র গঠনের ভৌতিক মুকুটের মতো, যেখানে বর্গ আকারের সরল জ্যামিতি ভিমানের পিরামিডীয় সোপানতন্ত্রের সঙ্গে ধারণাগত সংলাপ রচনা করে। ব্রিহদীশ্বরের ভিমানার এই রৈখিক, সীমানির্ধারিত পিরামিডীয় রূপটি পরবর্তী গঙ্গাইকোন্ডাচোলপুরম মন্দিরে দেখা কার্ভিলিনিয়ার প্রোফাইল থেকে স্পষ্টত আলাদা; ফলে চোলীয় ধারার ভেতরেই আমরা রূপবিন্যাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিবর্তনরেখা শনাক্ত করতে পারি। সমগ্র পরিসর, প্রাঙ্গণের পরিমাপ, ভিমানের উচ্চতা ও শিখরের বর্গাকারতা—এই সবকিছু মিলিয়ে একটি জ্যামিতির সুশৃঙ্খল মেলবন্ধন ঘটে, যেখানে দৈর্ঘ্য-প্রস্থ-উচ্চতার অনুপাত, দৃশ্যাবলীর ধাপে ধাপে উন্মোচন এবং ঘেরাটোপের ক্লয়েস্টার-পরিসর একত্রে স্থাপত্যকে কার্যকর ও নন্দনসম্মত করে তোলে।

Brihadisvara Temple during Maha Shivaratri WUS03611 (edit)
ব্রিহদীশ্বর মন্দির, থাঞ্জাভুর: চোলা স্থাপত্য ও অবিশ্বাস্য জ্যামিতির এক মহাগাথা — Brihadisvara Temple during Maha Shivaratri WUS03611 (edit)

ভাস্কর্য, শিলালিপি ও আইকনোগ্রাফি

ব্রিহদীশ্বর মন্দিরের অন্তর্গত ভাস্কর্যসম্ভার ও চিত্র-মালিকাকে দেখলে বোঝা যায়, এখানে দেবালয়ের নন্দনতত্ত্ব নিছক অলংকার নয়; বরং উপাসনা, শাস্ত্র ও সামাজিক স্মৃতির সমবায়। গর্ভগৃহে স্থাপিত প্রায় ৮.৭ মিটার উচ্চতার বিশাল শিবলিঙ্গ—প্রধান দেবতার উপস্থিতিকে এক অনিবার্য ভৌতিক রূপে তুলে ধরে; তার সামনে প্রাঙ্গণে রয়েছে শিবের বাহন নন্দির একখণ্ড গ্রানাইট থেকে গড়া বিশাল মূর্তি, যার ওজন প্রায় ২৫ টন—এই দুটি কেন্দ্রীয় আইকনের ভারসাম্যে মন্দিরের অক্ষ ও দর্শন-ক্রম সুদৃঢ় হয়। প্রাঙ্গারের দেয়াল ও পরিসরে ছড়িয়ে আছে দেবী-দেবতার জীবন্ত মূর্তি—দুর্গা, লক্ষ্মী, সরস্বতী, ভিক্ষটন, বিরভদ্র, নাটেশ, অর্ধনারীশ্বর প্রভৃতি—যাদের প্রতিটি রূপচর্চায় অনুষঙ্গ, ভঙ্গি ও অভিব্যক্তির সংযমিত সুষমা লক্ষ্য করা যায়। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য মন্দিরের অভ্যন্তরের ৮১টি করণা-ভিত্তিক নৃত্যভাস্কর্য, যা ভারতীয় নৃত্যশাস্ত্রের গতিসংগীতের শিলৌজ্জ্বল দলিল; অঙ্গভঙ্গির রৈখিকতা, ছন্দের সমাস ও দেহভাষার মুদ্রা-নির্দেশে এই ভাস্কর্যগুলি উপাসনা ও অভিনয়ের প্রাচীন সেতুবন্ধন স্মরণ করিয়ে দেয়। এ ছাড়া মন্দিরের দেয়ালে চোলা যুগের মুরালচিত্রে ঐতিহাসিক ও পৌরাণিক দৃশ্যাবলী সজীবভাবে ধরা পড়েছে; পরে নায়ক যুগে, আনুমানিক ষোড়শ শতকে, কিছু অংশে উপরিস্থ চিত্রায়ণ সংযোজিত হয়, ফলে আমরা স্তরিত চিত্র-ইতিহাসের এক অনন্য সাক্ষ্য পাই, যেখানে প্রাথমিক রঙরস ও পরবর্তী সংযোজনের সংলাপ স্পষ্ট। ব্রোঞ্জের নাটরাজ মূর্তি নির্মাণের কথাও এই পরিসরের শিল্পসাধনার সঙ্গে যুক্ত—যা চোলীয় ধাতুশিল্পের সূক্ষ্মতা ও শৈল্পিক পরিমিতির পরিচয় বহন করে। শিলালিপির ক্ষেত্রেও ব্রিহদীশ্বর অনন্য; মন্দিরের দেয়ালে তামিল ও গ্রন্থ লিপিতে খোদাই করা শতাধিক শিলালিপি রয়েছে, যেখানে রাজরাজা চোলার দান, পুণ্যকর্ম, মন্দির পরিচালনার রূপরেখা ও সেই সময়কার সামাজিক-অর্থনৈতিক বিবরণ সুনির্দিষ্টভাবে উল্লিখিত। এই নথিপত্রে মন্দিরকর্মীদের নাম, বেতন ও দায়িত্বের বিস্তারিত বিধান যেমন আছে, তেমনি পরবর্তী রাজাদের দান ও সংস্কারের তথ্যও সংরক্ষিত; অর্থাৎ মন্দিরকে ঘিরে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রশাসনিক কাঠামো কীভাবে পরিচালিত হত, তা স্পষ্ট হয়। শিলালিপি থেকে জানা যায়, মন্দিরে নৃত্যশিল্পী, সঙ্গীতজ্ঞ, পুরোহিত ও অন্যান্য কর্মী নিয়োগিত ছিলেন—ফলে উপাসনা, অভিনয় ও দৈনন্দিন ব্যবস্থাপনার এক আন্তঃসম্পর্কিত পরিসর গড়ে উঠেছিল। শিলালিপি ও মুরাল মিলিয়ে চোলা যুগের সাংস্কৃতিক ও সামাজিক চিত্র এমনভাবে ফুটে ওঠে, যাতে শিল্প, ধর্ম ও প্রশাসনকে আলাদা করে দেখা কঠিন; তারা একে অপরের পরিপূরক ও অনুসারী।

Davide 2 Brihadesvara Temple Tanjavur India
ব্রিহদীশ্বর মন্দির, থাঞ্জাভুর: চোলা স্থাপত্য ও অবিশ্বাস্য জ্যামিতির এক মহাগাথা — Davide 2 Brihadesvara Temple Tanjavur India

সাংস্কৃতিক তাৎপর্য

ব্রিহদীশ্বর মন্দির শৈব ধারার অন্যতম প্রধান তীর্থস্থান; এখানে প্রধান দেবতা শিব, যার বৃহৎ লিঙ্গমূর্তি কেবল ধর্মীয় প্রতীকের গৌরবই নয়, চোলা নন্দনবোধেরও প্রমাণ। প্রায় এক হাজার বছর ধরে ধারাবাহিক পূজা, নিয়মিত আচার এবং বার্ষিক উৎসব এ মন্দিরকে জীবন্ত স্মারকে পরিণত করেছে; বিশেষত মহা শিবরাত্রি এবং নৃত্যোৎসবের অনুষঙ্গে মন্দির-প্রাঙ্গণ হয়ে ওঠে নৃত্য, সঙ্গীত ও উপাসনার সম্মিলিত মঞ্চ। চোলা সাম্রাজ্যের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক শক্তির প্রতীক হিসেবে ব্রিহদীশ্বর একদিকে রাজকীয় ঐশ্বর্যের প্রতিফলন, অন্যদিকে জনমানসে সংহত ধর্মীয় চেতনার বাহক; ফলে এটি কেবল স্থাপত্য নয়, এক সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান। দেয়ালের ৮১ করণা-ভিত্তিক ভাস্কর্য ও ব্রোঞ্জের নাটরাজ ধারার উল্লেখ একই সূত্রে গাঁথা, যেখানে নৃত্য একদিকে ভাবপ্রকাশ, অন্যদিকে শাস্ত্রসম্মত গতিসংলগ্নতা—এ মন্দিরে তার প্রতিফলন অনবদ্য। গঙ্গাইকোন্ডাচোলপুরম ও আইরাভতেশ্বরের সঙ্গে গ্রেট লিভিং চোলা টেম্পলস হিসেবে যে সম্মিলিত স্বীকৃতি মিলেছে, তাতে চোলীয় শিল্প-ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা স্পষ্ট; ব্রিহদীশ্বরের সরল পিরামিডীয় ভিমানা যেমন এক নির্ভীক রৈখিকতার প্রতীক, তেমনি এই ধারার পার্শ্ববর্তী মন্দিরসমূহে রূপবিন্যাসের পরিবর্তন চোলীয় নন্দনতত্ত্বের বহুমাত্রিকতা দেখায়। ধারাবাহিক উপাসনা ও উৎসব আয়োজন এই মন্দিরকে একটি ক্রিয়াশীল সাংস্কৃতিক পরিসরে ধরে রেখেছে; এখানে ভাস্কর্য, মুরাল, শিলালিপি ও সঙ্গীত-নৃত্যের অনুশীলন এক জীবিত স্মৃতি, যা কেবল অতীতের জৌলুস নয়, বর্তমানেরও অস্তিত্ব। অতএব ব্রিহদীশ্বর একদিকে ভারতীয় শাস্ত্র ও শিল্পের সমন্বিত পাঠশালা, অন্যদিকে স্মৃতি ও পরিচয়ের আধার—যেখানে স্থাপত্যের জ্যামিতি ও উপাসনার ছন্দ যুগলবন্দিতে স্থায়ী অর্থ পায়।

Davide Brihadesvara Temple Tanjavur India
ব্রিহদীশ্বর মন্দির, থাঞ্জাভুর: চোলা স্থাপত্য ও অবিশ্বাস্য জ্যামিতির এক মহাগাথা — Davide Brihadesvara Temple Tanjavur India

দর্শন ও প্রবেশ সংক্রান্ত তথ্য

থাঞ্জাভুরের কেন্দ্রে অবস্থিত হওয়ায় ব্রিহদীশ্বর মন্দিরে পৌঁছনো সহজ; শহরটি রেল ও সড়কপথে ভালভাবে সংযুক্ত। নিকটতম বিমানবন্দর তিরুচিরাপল্লি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, যা প্রায় ৫৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত; সেখান থেকে সড়কপথে থাঞ্জাভুরে পৌঁছানো সুবিধাজনক। মন্দির প্রতিদিন সকাল ৬টা থেকে দুপুর ১২টা ৩০ মিনিট এবং বিকেল ৪টা থেকে রাত ৮টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত খোলা থাকে; প্রবেশ ফি নেই, তাই দর্শনার্থীরা অবাধে প্রাঙ্গণে প্রবেশ করতে পারেন। স্থির চিত্রগ্রহণ ও ভিডিওগ্রহণে কোনো ফি ধার্য নয়; তবে পেশাদার ক্যামেরা ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় অনুমতি গ্রহণ আবশ্যক। দর্শনের সময় ও নিয়মাবলি মেনে চলা, প্রাঙ্গণের পরিচ্ছন্নতা রক্ষা করা এবং ভাস্কর্য ও মুরালের প্রতি সংবেদনশীল থাকা—এই মৌলিক আচরণবিধি মেনে চললে দর্শন অভিজ্ঞতা সমৃদ্ধ হয়। বৃহৎ প্রাঙ্গণ, গোপুরাম-সজ্জিত প্রবেশপথ ও পিরামিডীয় ভিমানার ধারাবাহিক উন্মোচনের জন্য পর্যাপ্ত সময় নিয়ে এলে স্থাপত্যের পরিমিতি ও ভাস্কর্য-শিলালিপির সূক্ষ্মতা নিবিড়ভাবে অনুভব করা যায়। যারা শাস্ত্রীয় নৃত্য ও সঙ্গীতে আগ্রহী, তাদের পক্ষে করণা-ভিত্তিক ভাস্কর্য ও নাটেশ-রূপের কাছাকাছি পর্যবেক্ষণ একটি অনন্য অভিজ্ঞতা; আবার যারা ঐতিহাসিক নথিপত্রে আগ্রহী, তারা প্রাঙ্গণের দেয়ালে ছড়িয়ে থাকা তামিল ও গ্রন্থ লিপির শিলালিপির বিন্যাস লক্ষ্য করলে মন্দির-ব্যবস্থাপনা ও দানের ইতিহাস সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাবেন।

Details Brihadesvara Temple Tanjavur India sophie hervaux
ব্রিহদীশ্বর মন্দির, থাঞ্জাভুর: চোলা স্থাপত্য ও অবিশ্বাস্য জ্যামিতির এক মহাগাথা — Details Brihadesvara Temple Tanjavur India sophie hervaux

উপসংহার

ব্রিহদীশ্বর মন্দির ভারতের মধ্যযুগীয় স্থাপত্যের এমন এক শিখর, যেখানে ধর্মীয় আচার, রাজনৈতিক শক্তি ও শিল্প-প্রকৌশলের সুনির্বাচিত সংহতি দেখা যায়। ১০০৩ থেকে ১০১০ খ্রিস্টাব্দে রাজরাজা চোলা প্রথমের ইচ্ছাশক্তি ও শৈল্পিক দূরদর্শিতার যে具রূপায়ণ আমরা এখানে দেখি—গ্রানাইটের অনমনীয়তা, মর্টারবিহীন ইন্টারলকিং, ১৩ তলার পিরামিডীয় ভিমানা, ৮০ টনের একক শিখর-ব্লক, ৮.৭ মিটার উচ্চ লিঙ্গ, ২৫ টনের নন্দি, ৮১টি করণা-ভাস্কর্য, এবং স্তরিত মুরালচিত্র—তা যুগে যুগে শিল্পসংস্কৃতির মৌলিক প্রশ্নগুলিকে সামনে আনে: রূপ ও অর্থের সম্পর্ক কী, ক্ষমতা ও নন্দনের সেতুবন্ধন কোথায়, এবং পাথরে খোদাই করা স্মৃতি কীভাবে আমাদের সামাজিক চেতনা নির্মাণ করে। গঙ্গাইকোন্ডাচোলপুরম ও আইরাভতেশ্বরের সঙ্গে বিশ্ব ঐতিহ্যভুক্ত এই মন্দির কেবল চোলীয় ঐতিহ্যের মানচিত্রই আঁকে না; বরং জ্যামিতির এমন এক ভাষা রচনা করে, যেখানে প্রাঙ্গণের দৈর্ঘ্য-প্রস্থের শৃঙ্খলা, ভিমানার তলা-তলার ক্রমহ্রাসমান ছন্দ, ও শিখরের বর্গাকার রূপরেখা মিলিয়ে স্থায়িত্ব, সৌন্দর্য ও তাৎপর্যের সমাহার ঘটে। ধারাবাহিক উপাসনা, উৎসব ও শিল্পচর্চা মন্দিরটিকে এক জীবন্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে ধরে রেখেছে; শিলালিপি ও মুরালচিত্র সেই জীবনের নথিবদ্ধ পরম্পরা। তাই ব্রিহদীশ্বরকে যখন আমরা দেখি, তখন কেবল এক মহৎ মন্দির দেখি না; দেখি এক সহস্র বছরের বেশি সময়জুড়ে চলমান এক সাংস্কৃতিক মহাগাথা, যেখানে শিলায় লেখা ইতিহাস, ভাস্কর্যে ধরা নন্দন, এবং স্থাপত্যে রচিত অনবদ্য জ্যামিতি আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক ও অনুপ্রেরণাদায়ক।

Entrance Brihadesvara Temple Tanjavur India QiNi
ব্রিহদীশ্বর মন্দির, থাঞ্জাভুর: চোলা স্থাপত্য ও অবিশ্বাস্য জ্যামিতির এক মহাগাথা — Entrance Brihadesvara Temple Tanjavur India QiNi

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More
articles