হাগিয়া সোফিয়া: বাইজেন্টাইন বাসিলিকা থেকে সমসাময়িক প্রতীক—ইস্তাম্বুলের এক অনন্য স্থাপত্যযাত্রা
Hagia Sophia

হাগিয়া সোফিয়া: বাইজেন্টাইন বাসিলিকা থেকে সমসাময়িক প্রতীক—ইস্তাম্বুলের এক অনন্য স্থাপত্যযাত্রা

ইস্তাম্বুলের ফাতিহ জেলায়, সুলতানাহমেত চত্বরে ব্লু মসজিদের বিপরীতে ও টপকাপি প্যালেসের পাশে দাঁড়িয়ে আছে হাগিয়া সোফিয়া—একটি স্থাপনা যার অন্দরের আলো-ছায়া, প্রার্থনার শব্দ ও ইতিহাসের স্তরবিন্যাস মিলেমিশে তৈরি করেছে বিশ্বনগর ইস্তাম্বুলের এক অবিচ্ছেদ্য পরিচয়। বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের ধর্মীয়-রাজনৈতিক শক্তির কেন্দ্র থেকে অটোমান যুগের মুসলিম স্থাপত্য-ঐতিহ্যের প্রধান নিদর্শন, তারপর জাদুঘর পর্ব পেরিয়ে আজ আবার মসজিদ—এই দীর্ঘ রূপান্তরই হাগিয়া সোফিয়াকে কেবল একটি ভবন না রেখে করেছে এক জীবন্ত স্মৃতিস্তম্ভ। ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে স্বীকৃত এই স্থাপনা প্রাচীন ও আধুনিকের সেতুস্বরূপ; এর গম্বুজ, মোজাইক, মিনার ও ক্যালিগ্রাফির মধ্যে জড়িয়ে আছে সহাবস্থান ও সংমিশ্রণের গল্প, যা শোনা যায় শহরের বাতাসে, দেখা যায় ভ্রমণকারীর মুগ্ধ চোখে, আর অনুভব করা যায় স্থানীয় জীবনের চলাচলে।

ঐতিহাসিক পটভূমি

হাগিয়া সোফিয়ার ইতিহাস শুরু হয় খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতকে। এই স্থানে প্রথম গির্জা নির্মিত হয় ৩৬০ খ্রিস্টাব্দে, যখন বাইজেন্টাইন শক্তি ইস্তাম্বুল—তৎকালীন কনস্টান্টিনোপল—কে কেন্দ্র করে ধর্মীয় ও প্রশাসনিক কাঠামোকে সুসংহত করছিল। কিন্তু ৪০৪ খ্রিস্টাব্দে অগ্নিকাণ্ডে সেই প্রাথমিক গির্জা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। ধ্বংসস্তূপের মাঝেই নতুন করে গড়ার আকাঙ্ক্ষায় ৪১৫ খ্রিস্টাব্দে দ্বিতীয় গির্জা নির্মাণ করা হয়; তবু ইতিহাস তখনও স্থির ছিল না। ৫৩২ খ্রিস্টাব্দের নিকা বিদ্রোহ শহরের অনেক স্থাপনার সঙ্গে এই গির্জাটিও বিলীন করে দেয়।

Domes Hagia Sophia Grand Mosque Bizantine daniel burka © Daniel Burka
হাগিয়া সোফিয়া: বাইজেন্টাইন বাসিলিকা থেকে সমসাময়িক প্রতীক—ইস্তাম্বুলের এক অনন্য স্থাপত্যযাত্রা — Domes Hagia Sophia Grand Mosque Bizantine daniel burka © Daniel Burka

এই পর্বেই আবির্ভাব ঘটে বর্তমান হাগিয়া সোফিয়ার। সম্রাট জাস্টিনিয়ান I, রাজ্যের মহিমা ও ধর্মীয় কেন্দ্রকে এক অনন্য প্রতীকে রূপ দেওয়ার সংকল্প নিয়ে ৫৩২ থেকে ৫৩৭ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে নির্মাণ করান এই বিশাল বাসিলিকা-ধর্মী গির্জা। বাইজেন্টাইন স্থাপত্য-দর্শনের উৎকর্ষ, প্রকৌশল উদ্ভাবন আর শিল্পকলার সংমিশ্রণে নির্মিত এই অম্লান স্মৃতি প্রায় দেড় সহস্রাব্দ ধরে শহরের আকাশরেখাকে আলোকিত করে আসছে।

তবু ইস্তাম্বুলের ইতিহাসে উত্থান-পতনের ধারাবাহিকতা যেমন ছিল, তেমনি ছিল ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ব্যবহারের পরিবর্তনশীলতা। ১২০৪ থেকে ১২৬১ পর্যন্ত ল্যাটিন শাসনের সময় হাগিয়া সোফিয়া ল্যাটিন ক্যাথলিক গির্জা হিসেবে ব্যবহৃত হয়, যা শহরের ক্ষমতাকাঠামোর আরেকটি অধ্যায়ের প্রতিফলন। ১৪৫৩ সালে অটোমান সুলতান মেহমেদ II কনস্টান্টিনোপল বিজয়ের পর এটি মসজিদে রূপান্তরিত করেন, এবং সেই পরিচয় বহাল থাকে দীর্ঘ চার শতাব্দীর বেশি সময়।

Hagia Sophia Floor Plan
হাগিয়া সোফিয়া: বাইজেন্টাইন বাসিলিকা থেকে সমসাময়িক প্রতীক—ইস্তাম্বুলের এক অনন্য স্থাপত্যযাত্রা — Hagia Sophia Floor Plan

শতকের পালাবদলে, আধুনিক তুরস্কের গঠনের প্রেক্ষাপটে ১৯৩৫ সালে কেমাল আতাতুর্কের উদ্যোগে হাগিয়া সোফিয়া জাদুঘরে রূপান্তরিত হয়। এর ফলে স্থাপনাটি নানা সময়ের স্থাপত্য ও শিল্পকলার দলিল হিসেবে উন্মুক্ত হয়ে ওঠে বিশ্বদর্শকের জন্য। পরবর্তীতে, ২০২০ সালে প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যিপ এরদোগানের ঘোষণায় এটি পুনরায় মসজিদে রূপান্তরিত হয়। প্রতিটি রূপান্তরই ছিল সময়ের ধর্মীয়-সামাজিক প্রয়োজন ও ঐতিহাসিক বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত; এবং আজও হাগিয়া সোফিয়ার ইতিহাস পড়লে বোঝা যায়, কীভাবে একটি স্থাপনা বিভিন্ন ক্ষমতার মানচিত্রে বারবার নতুন পরিচয়ের আভা পায়।

আর্কিটেকচার এবং ডিজাইন

হাগিয়া সোফিয়া বাইজেন্টাইন স্থাপত্যের এক অনন্য নিদর্শন, যার দর্শনীয় শক্তি নিহিত আছে কেন্দ্রীয় গম্বুজে। এই গম্বুজের ব্যাসার্ধ প্রায় ৩১ মিটার, আর তাকে ভরকেন্দ্রে স্থির রাখতে গম্বুজের নিচে ব্যবহৃত হয়েছে চারটি পেন্ডেন্টিভ—স্থাপত্য-প্রকৌশলের এমন এক কৌশল যা বর্গাকার ভিত্তি থেকে গোলাকার গম্বুজে ভারসাম্যপূর্ণ রূপান্তর ঘটায়। এই বিন্যাসের মাধুর্য কেবল গঠনগত নয়; এটি আলো ও উচ্চতার অভিজ্ঞতাকে এমন এক নীরব নাটকে পরিণত করে, যেখানে দর্শনার্থী নিজের অবস্থান ভুলে কেবল স্থাপনার অন্তর্লোকের দিকে মনোযোগী হন।

Hagia Sophia Section
হাগিয়া সোফিয়া: বাইজেন্টাইন বাসিলিকা থেকে সমসাময়িক প্রতীক—ইস্তাম্বুলের এক অনন্য স্থাপত্যযাত্রা — Hagia Sophia Section

গম্বুজের চারপাশে ৪০টি জানালা থেকে প্রবেশ করা আলো অভ্যন্তরের পরিসরকে এক ধরনের আকাশীয় দীপ্তিতে ভাসিয়ে তোলে। এই আলোকপ্রবাহ দিনের ভিন্ন ভিন্ন সময়ে দেয়াল, কলাম ও অর্ধগম্বুজে নানা অনুপাতে ছায়ার রেখা ফেলে, ফলে একই স্থাপত্য আপনাকে বারবার নতুনরূপে স্বাগত জানায়। স্থাপনার অভ্যন্তরে যে প্রাচীন মার্বেল কলামগুলি দেখা যায়, সেগুলোর রঙ, শিরা ও পালিশ করা পৃষ্ঠসমূহ ইতিহাসের স্পর্শে একধরনের সংযত ঔজ্জ্বল্য লাভ করেছে। সেই সঙ্গে সোনালী মোজাইকের নকশা ও উপস্থাপনা হাগিয়া সোফিয়ার প্রারম্ভিক সৌন্দর্যের গুরুত্বপূর্ণ স্তরকে সামনে আনে—একটি স্তর যা চিত্রভাষা ও ধর্মীয় অনুষঙ্গের মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ আখ্যানকে বর্ণময়তা দেয়।

অটোমান আমলে স্থাপত্যের ভাষায় নতুন সংযোজন ঘটে। চারটি মিনার স্থাপিত হয়, যা আকাশরেখায় গম্বুজকে চারদিক থেকে ফ্রেম করে রাখে। একইসঙ্গে, ইসলামিক ক্যালিগ্রাফির উপস্থিতি—বিভিন্ন আয়াত, নাম ও শিলালিপির অনুপ্রবেশ—অভ্যন্তরের দৃশ্যপটে আরেকটি গভীরতা তৈরি করে। এই ক্যালিগ্রাফি ও বাইজেন্টাইন মোজাইকের সহাবস্থান হাগিয়া সোফিয়ার সবচেয়ে লক্ষণীয় পরিচয়গুলোর একটি: যেন একই ক্যানভাসে দুই ধারার শিল্প ঐতিহ্য পাশাপাশি শ্বাস নেয়, সংঘাতে নয়, বরং সন্নিকটে অবস্থান করে।

Hagia Sophia Section 1
হাগিয়া সোফিয়া: বাইজেন্টাইন বাসিলিকা থেকে সমসাময়িক প্রতীক—ইস্তাম্বুলের এক অনন্য স্থাপত্যযাত্রা — Hagia Sophia Section 1

এই স্থাপত্যে পরিকল্পনার যে সমন্বয় দেখা যায়, তা বাইজেন্টাইন ও অটোমান রীতির মেলবন্ধনের এক ব্যতিক্রমী পাঠ। বাইরের বলিষ্ঠ রূপ—মিনার, বাট্রেসমতো সমর্থন ও প্রবেশপথের গাম্ভীর্য—যেখানে দর্শককে শহরের সঙ্গে সংলাপে আমন্ত্রণ জানায়, সেখানে ভেতরে গিয়ে দৃশ্যপটে দেখা যায় লঘুতা, অনুপাতের কোমলতা ও আলোর মৃদু আধিপত্য। গম্বুজ থেকে ঝরে পড়া আলো, পেন্ডেন্টিভের বাঁক, অর্ধগম্বুজ ও দেয়ালতলের সম্পর্ক—সব মিলিয়ে হাগিয়া সোফিয়া এক পরিমিত কিন্তু বোধনশীল স্থাপত্যসম্ভার, যেখানে স্থায়িত্ব ও সৌন্দর্য একে অপরকে সমর্থন করে।

এই সৌন্দর্য রক্ষা এবং প্রকৌশলগত স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে সময়ে সময়ে হয়েছে সংস্কার ও সংরক্ষণ। উনিশ শতকে সুইস-ইতালিয়ান ফোসাতি ব্রাদার্স এর দ্বারা হাগিয়া সোফিয়ায় ব্যাপক সংস্কারকাজ হয়, যা স্থাপনাটির অখণ্ডতা ও ব্যবহারযোগ্যতা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ১৯৩০ ও ১৯৫০-এর দশকে বাইজেন্টাইন মোজাইক পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়া হয়, এবং ১৯৫৮ সালে অ্যালেকজান্ডার মোজাইক পুনরুদ্ধার স্থাপত্যের ভিজ্যুয়াল ঐতিহ্যকে আরও পাঠযোগ্য করে তোলে। ১৯৯০ ও ২০০০-এর দশকেও বিভিন্ন রক্ষণাবেক্ষণ ও স্থাপত্যগত মেরামত চলতে থাকে। ১৯৯৫ থেকে ২০০২ পর্যন্ত ওয়ার্ল্ড মনুমেন্টস ফান্ডের সহায়তায় গম্বুজের স্থায়িত্ব উন্নয়নের যে কাজ হয়েছে, তা দীর্ঘস্থায়ী সংরক্ষণের প্রেক্ষিতে একটি উল্লেখযোগ্য ধাপ হিসেবে বিবেচিত। বর্তমানে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কার অব্যাহত রয়েছে, যাতে স্থাপনার স্মারকত্ব রক্ষা পায় ব্যবহারিক প্রয়োজনের পাশাপাশি।

Hagia Sophia Section 2
হাগিয়া সোফিয়া: বাইজেন্টাইন বাসিলিকা থেকে সমসাময়িক প্রতীক—ইস্তাম্বুলের এক অনন্য স্থাপত্যযাত্রা — Hagia Sophia Section 2

সাধরন মানুষের জীবন

হাগিয়া সোফিয়া এমন এক স্থান যেখানে স্থাপত্য কেবল দেয়াল বা গম্বুজে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা ছড়িয়ে পড়ে মানুষের স্মৃতি, আচার, অনুষ্ঠানে এবং দৈনন্দিন জীবনে। বাইজেন্টাইন আমলে এটি ছিল কেন্দ্র, যেখানে ধর্মীয় আচার ও সাম্রাজ্যিক আভিজাত্য মিলেমিশে শহরের রাজনৈতিক কণ্ঠস্বরকে শক্তি দিত। বিশাল গির্জা হিসেবে এর গুরুত্ব শহরের নাগরিক জীবনে এক ধরনের স্থিতি ও অভিভাবকত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিল। সেই ধারাবাহিকতায় ল্যাটিন শাসনের সময় এটি অন্য এক আচার-অনুশীলনের ধারক হয়ে ওঠে, আর ১৪৫৩-র পর থেকে অটোমান যুগে মসজিদ হিসেবে এর দৈনন্দিনতা বদলে যায় প্রার্থনার সময়সূচি, চত্বরের সামাজিকতা, ও ইস্তাম্বুলের মুসলিম নগর-সংস্কৃতির ধারাবাহিকতার সঙ্গে।

জাদুঘর পর্বে এসে হাগিয়া সোফিয়া বিশ্ব-ভ্রমণকারীদের এক শেখার স্থান রূপে আত্মপ্রকাশ করে—যেখানে বিভিন্ন যুগের শিল্প ও স্থাপত্য একই ছাদের নিচে দেখা সম্ভব হয়েছিল। এই উন্মুক্ততা ইস্তাম্বুলের নগর-পর্যটনে নতুন দিগন্ত খুলে দেয়, এবং একে আঞ্চলিক সম্পদ থেকে বৈশ্বিক ঐতিহ্যের পরিসরে সুপ্রতিষ্ঠিত করে। ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতি এই দীর্ঘ স্মৃতি-নির্মাণেরই মূল্যায়ন, যা স্থানীয় গর্ব ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের মধ্যকার সংযোগকে সুদৃঢ় করেছে।

Hagia Sophia Grand Mosque Bizantine © Imad Alassiry
হাগিয়া সোফিয়া: বাইজেন্টাইন বাসিলিকা থেকে সমসাময়িক প্রতীক—ইস্তাম্বুলের এক অনন্য স্থাপত্যযাত্রা — Hagia Sophia Grand Mosque Bizantine © Imad Alassiry

আবার ২০২০ সাল থেকে মসজিদে প্রত্যাবর্তনের ফলে স্থাপনাটির ব্যবহারে যে পরিবর্তন এসেছে, তা স্থানীয় জীবনের সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয়েছে প্রার্থনা, ধর্মীয় নিমগ্নতা ও আচার-অনুষঙ্গের ধারায়। একইসঙ্গে দর্শনীয় স্থান হিসেবে এটি আজও উন্মুক্ত; দর্শনার্থীর পদচারণায় সুলতানাহমেত চত্বরের ব্যস্ততা ও প্রশান্তি একসঙ্গে অনুভূত হয়। নানা ধর্ম ও সংস্কৃতির চিহ্ন বহনকারী হাগিয়া সোফিয়া মানুষকে শেখায় স্থানের স্মৃতি কিভাবে বহুমাত্রিক হতে পারে—কখনও প্রার্থনার কণ্ঠে, কখনও মোজাইকের ঝিলিকে, কখনও বা মিনারের ছায়ায়।

এই সহাবস্থানের অভিজ্ঞতা ইস্তাম্বুলের নাগরিক মনের ভেতরেও এক ধারাবাহিকতা তৈরি করেছে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে হাগিয়া সোফিয়া হয়ে উঠেছে মিলনস্থল, পরিচয়ের মানচিত্র, আর নগর-স্মৃতির দৃঢ় ভিত্তি। এমনকি সাম্প্রতিক রূপান্তর আন্তর্জাতিক আলোচনার জন্ম দিলেও, স্থানের প্রতীকী মূল্য স্থানীয় জীবনে কাজ করে পরিমিতির ভিতরে—যেখানে সংস্কৃতির সেতুবন্ধনই মুখ্য, এবং অতীতের অধ্যায়গুলো পড়া হয় শ্রদ্ধার সঙ্গে, তর্কের চড়া সুরে নয়।

Structure Hagia Sophia Grand Mosque Bizantine diego allen © Daniel Burka
হাগিয়া সোফিয়া: বাইজেন্টাইন বাসিলিকা থেকে সমসাময়িক প্রতীক—ইস্তাম্বুলের এক অনন্য স্থাপত্যযাত্রা — Structure Hagia Sophia Grand Mosque Bizantine diego allen © Daniel Burka

পরিদর্শন / প্রবেশাধিকার তথ্য

আজ হাগিয়া সোফিয়া একটি সক্রিয় মসজিদ, তাই নামাজের সময়ে অভ্যন্তরের কিছু অংশ দর্শনার্থীদের জন্য সাময়িকভাবে বন্ধ থাকে। নামাজের বাইরের সময়ে দর্শনার্থীরা প্রবেশ করতে পারেন; তবে শালীন পোশাক বজায় রাখা উচিত এবং মহিলাদের জন্য মাথায় স্কার্ফ পরিধান বাধ্যতামূলক। এই মৌলিক নিয়মগুলো স্থাপনার ধর্মীয় মর্যাদা ও অভ্যন্তরের পরিবেশ রক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

আন্তর্জাতিক পর্যটকের জন্য ভ্রমণ-ব্যবস্থা আরও উপযোগী করতে সাম্প্রতিক সময়ে কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। ২০২৪ সাল থেকে বিদেশী দর্শনার্থীদের জন্য প্রবেশ ফি আরোপিত হয়েছে, যা ব্যবস্থাপনার মানোন্নয়ন, রক্ষণাবেক্ষণ ও দর্শনার্থীসেবার সমন্বয়ে সহায়তা করে। একইসঙ্গে উপরের গ্যালারিগুলো দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকায় স্থাপনার অভ্যন্তরকে ভিন্ন উচ্চতা থেকে দেখার সুযোগ মেলে—গম্বুজ, জানালার আলো ও মোজাইকের বিন্যাস তখন আরেকভাবে দৃশ্যমান হয়।

dmitry limonov Exterior dome Hagia Sophia Grand Mosque © Dmitry Limonov
হাগিয়া সোফিয়া: বাইজেন্টাইন বাসিলিকা থেকে সমসাময়িক প্রতীক—ইস্তাম্বুলের এক অনন্য স্থাপত্যযাত্রা — dmitry limonov Exterior dome Hagia Sophia Grand Mosque © Dmitry Limonov

পর্যটন-অভিজ্ঞতাকে তথ্যসমৃদ্ধ করতে গাইডেড ট্যুর ও অডিও গাইডের সুবিধা রয়েছে। এর ফলে একজন দর্শনার্থী নিজের সময় ও আগ্রহ অনুযায়ী দেখা ও বোঝার গভীরতা বাড়াতে পারেন—কখনও স্থাপত্যের ভাষা, কখনও ইতিহাসের বাঁক, কখনও বা শিল্পকলার সূক্ষ্ম রেখা অনুসরণ করে। যেহেতু কিছু অংশ সময়বিশেষে সীমিতভাবে প্রবেশযোগ্য হতে পারে, আগেভাগে সময়সূচি দেখে নেওয়া এবং প্রার্থনার সময়কে সম্মান জানিয়ে ভিজিট পরিকল্পনা করাই সর্বোত্তম।

শেষ কথা

হাগিয়া সোফিয়া এমন এক স্থাপত্য-গল্প, যেখানে সময়ের পাতায় পাতায় যোগ হয়েছে নতুন ব্যবহার, নতুন রীতি, নতুন স্মৃতি। বাইজেন্টাইন গির্জা থেকে অটোমান মসজিদ, তারপর জাদুঘরের উন্মুক্ততা ও সমসাময়িক মসজিদের ধারাবাহিকতা—প্রতিটি পর্বই এই স্থাপনার পরিচয়কে বিস্তৃত করেছে। ৩১ মিটার ব্যাসার্ধের গম্বুজ, চারটি পেন্ডেন্টিভের কৌশল, ৪০টি জানালা দিয়ে প্রবাহিত আলোকরেখা, মার্বেলের কলাম আর সোনালী মোজাইকের দীপ্তি—সব মিলিয়ে হাগিয়া সোফিয়া কেবল নির্মাণ-প্রযুক্তির সাফল্য নয়; এটি মানবসভ্যতার সংলাপ, সংমিশ্রণ আর সহাবস্থানের প্রতীক।

edib bildiren Hagia Sophia Grand Mosque Bizantine © Dmitry Limonov
হাগিয়া সোফিয়া: বাইজেন্টাইন বাসিলিকা থেকে সমসাময়িক প্রতীক—ইস্তাম্বুলের এক অনন্য স্থাপত্যযাত্রা — edib bildiren Hagia Sophia Grand Mosque Bizantine © Dmitry Limonov

সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণের পর্বগুলো দেখায়, ঐতিহ্য রক্ষা একটি চলমান প্রক্রিয়া—যেখানে অতীতকে অক্ষুণ্ণ রেখে বর্তমানের প্রয়োজন মেটাতে হয় সংবেদনশীল নীতির সহায়তায়। মোজাইক ও ইসলামিক ক্যালিগ্রাফির সংরক্ষণ ও প্রদর্শনের নীতি, সাম্প্রতিক রূপান্তরের প্রভাব, ভিন্ন ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক উপাদানের সমন্বয়, ভবিষ্যৎ মেরামতের প্রযুক্তিগত ও নীতিগত দিকনির্দেশনা, এবং দর্শনার্থীর নিরাপত্তা ও প্রবেশাধিকার—এই সবই আলোচ্য বিষয়, যা হাগিয়া সোফিয়ার মতো বিশ্বঐতিহ্য-স্থাপনার দীর্ঘজীবন নিশ্চিত করতে সহায়ক।

ইস্তাম্বুলের হৃদয়ে দাঁড়িয়ে হাগিয়া সোফিয়া আমাদের মনে করিয়ে দেয়—একটি শহর, একটি সংস্কৃতি, একটি সভ্যতা কেবল একক রেখায় অঙ্কিত হয় না। এর গম্বুজে জমা আলো, মিনারে ওঠা দৃষ্টিসীমা, চাতালে থমকে থাকা মানুষের পদচিহ্ন—সব মিলিয়ে এটি মানুষের তৈরি এমন এক আকাশ, যেখানে ইতিহাস, ধর্ম, শিল্প আর নগরজীবন একসঙ্গে সহাবস্থান করে। তাই হাগিয়া সোফিয়াকে পড়া মানে কেবল অতীতের মহিমা স্মরণ নয়; বরং বর্তমানের প্রতি সচেতন থাকা, এবং ভবিষ্যতের জন্য সংরক্ষণের সঠিক পথ খুঁজে নেওয়া। ইস্তাম্বুলের এই অনন্য স্থাপত্যযাত্রা তাই চিরকালই থাকবে শিক্ষার, সৌন্দর্যের ও সহাবস্থানের এক অনিঃশেষ পাঠ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More
articles