পশ্চিমবঙ্গ ও কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীরা এনইপি ও তহবিল নিয়ে তর্ক কিসের ওপর?
সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের শিক্ষামন্ত্রী এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী নতুন শিক্ষানীতি (National Education Policy – NEP) ও তার সঙ্গে সম্পর্কিত তহবিল বরাদ্দ নিয়ে বাক্যযুদ্ধে জড়িয়েছেন। এই বিতর্ক শিক্ষাঙ্গনের ভবিষ্যৎ এবং রাজ্যের শিক্ষানীতির প্রয়োগকে প্রভাবিত করতে পারে। এখানে আমরা বিষয়টি সংক্ষিপ্ত ও তথ্যভিত্তিকভাবে বিশ্লেষণ করব।
নতুন শিক্ষানীতি (NEP) ও তার প্রেক্ষাপট
২০২০ সালে কেন্দ্রীয় সরকার কর্তৃক ঘোষণা করা নতুন শিক্ষানীতি (NEP 2020) ভারতের শিক্ষাব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন আনার লক্ষ্য নিয়ে এসেছে। এই নীতির মূল উদ্দেশ্য হল শিক্ষাকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক, সমন্বিত ও গুণগত মানসম্পন্ন করা। NEP অনুসারে প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত শিক্ষাব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে বেশ কিছু নতুন কাঠামো এবং নির্দেশিকা প্রণয়ন করা হয়েছে।
কেন্দ্রীয় সরকারের তথ্য অনুযায়ী, NEP বাস্তবায়নের জন্য ২০২১-২০২৫ সালের মধ্যে প্রায় ৫ লাখ কোটি টাকা বরাদ্দের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে বিভিন্ন রাজ্যের জন্য নির্দিষ্ট তহবিল বরাদ্দ করা হয়েছে যাতে তারা নিজ নিজ রাজ্যের শিক্ষাব্যবস্থা উন্নত করতে পারে।
পশ্চিমবঙ্গের অবস্থান ও অভিযোগ
পশ্চিমবঙ্গ সরকার NEP বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় তহবিল বরাদ্দের অনিয়ম ও অসমতার অভিযোগ তুলেছে। রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রী জানিয়েছেন, পশ্চিমবঙ্গকে বরাদ্দকৃত তহবিল অন্যান্য রাজ্যের তুলনায় কম দেওয়া হচ্ছে, যা রাজ্যের শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নের ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করছে। তিনি আরও বলেছেন, “আমরা চাই সমান সুযোগ ও পর্যাপ্ত অর্থায়ন যাতে রাজ্যের বিদ্যালয় ও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো উন্নত করা যায়।”
এছাড়া, পশ্চিমবঙ্গ সরকার বিশেষভাবে উল্লেখ করেছে যে, NEP-র কিছু দিক রাজ্যের শিক্ষানীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক, বিশেষ করে স্থানীয় ভাষা ও সংস্কৃতির সংরক্ষণ নিয়ে। রাজ্য সরকার তাদের নিজস্ব শিক্ষানীতি বজায় রাখতে আগ্রহী, যা কেন্দ্রীয় নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে তারা মনে করছে।
কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিক্রিয়া
কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী এর উত্তরে জানান, NEP-র বাস্তবায়ন একটি সমন্বিত প্রক্রিয়া এবং সমস্ত রাজ্যের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা হচ্ছে। তিনি বলেন, “কেন্দ্রীয় সরকার ইতিমধ্যে রাজ্যগুলোর সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় তহবিল বরাদ্দ করছে এবং রাজ্যগুলোর বিশেষ প্রয়োজন বুঝে তহবিলের পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়।”
তাঁর মতে, NEP-র লক্ষ্য হলো দেশের সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা উন্নত করা, যা রাজ্যের নিজস্ব নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাস্তবায়ন করা সম্ভব। কেন্দ্রীয় মন্ত্রকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গকে মোট ১২ হাজার কোটি টাকার বেশি তহবিল বরাদ্দ করা হয়েছে, যা পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় ১৫% বৃদ্ধি।
আইনি ও প্রশাসনিক প্রেক্ষাপট
শিক্ষানীতি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে ক্ষমতা বণ্টন ভারতের সংবিধানের ৪০৫ ও ৪০৬ অনুচ্ছেদের আওতায় পরিচালিত হয়। শিক্ষাবিষয়ক অধিকাংশ নীতিমালা রাজ্যের বিষয় হলেও কেন্দ্রীয় নীতি প্রণয়ন ও তহবিল বরাদ্দে কেন্দ্রের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
বর্তমানে কেন্দ্র ও পশ্চিমবঙ্গ সরকার উভয়েই NEP বাস্তবায়নের জন্য আলাদা আলাদা কমিটি গঠন করেছে। পাশাপাশি, কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশিকা অনুসারে রাজ্যগুলোকে প্রতি বছর তাদের অগ্রগতি ও প্রয়োজনীয় পরিবর্তনগুলি রিপোর্ট করতে বলা হয়। এই রিপোর্টের ভিত্তিতেই পরবর্তী তহবিল বরাদ্দ নির্ধারণ করা হয়।
শিক্ষাক্ষেত্রে ভবিষ্যৎ প্রভাব
এই বিতর্কের কারণে পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষাব্যবস্থায় NEP বাস্তবায়নে কিছু বিলম্ব হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। রাজ্যের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও বিদ্যালয়গুলোকে আধুনিকীকরণে প্রয়োজনীয় তহবিলের অভাব শিক্ষার মানে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে, কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধি পেলে এবং রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব কমে গেলে শিক্ষাক্ষেত্রে ইতিবাচক ফলাফল আসার সম্ভাবনা রয়েছে। শিক্ষানীতির সঠিক বাস্তবায়ন দেশের যুবসমাজের দক্ষতা উন্নয়নে সহায়ক হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সূত্র: Google News West Bengal


