জোড়াফুলে চুনকাম নিয়ে তৃণমূল-বিজেপির গলসিতে কেন তুমুল আক্ষেপ চলছে
কি ঘটেছে: রাজনীতির নতুন মোড়ে গ্রাফিতি বিতর্ক
পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান শহরে সম্প্রতি তৃণমূল কংগ্রেস ও বিজেপির মধ্যে গ্রাফিতি বা দেওয়ালে রাজনৈতিক চিত্রাঙ্কন নিয়ে উত্তপ্ত বিতর্ক শুরু হয়েছে। শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে তৃণমূলের ‘জোড়াফুল’ প্রতীক আঁকা দেওয়ালে বিজেপি নেতাদের ‘চুনকাম’ বা সাদা রং দিয়ে মুছে ফেলার অভিযোগ উঠেছে। এর ফলে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং সাধারণ মানুষের নজরও এই বিতর্কের দিকে ঘুরে গেছে।
তৃণমূলের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, বিজেপি তাদের প্রচারচিত্র ধ্বংস করে রাজনীতিতে অশোভন পন্থা অবলম্বন করছে। অন্যদিকে বিজেপি দাবি করেছে, তারা শুধু অবৈধ গ্রাফিতি সরাচ্ছে, যা নগর সৌন্দর্যের জন্য ক্ষতিকর। এই ঘটনা বর্ধমানের রাজনীতির মঞ্চে নতুন উত্তেজনার সৃষ্টি করেছে।
কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ: নাগরিক জীবনে প্রভাব ও রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা
গ্রাফিতি বা দেওয়াল চিত্রাঙ্কনের মতো বিষয় সাধারণত নগরীর সাংস্কৃতিক বহুমুখিতা প্রকাশ করে। তবে যখন তা রাজনৈতিক প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তখন তা শুধুমাত্র একটি রাজনৈতিক বার্তা নয়, বরং নাগরিক জীবনে একটি বিতর্কের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বর্ধমানের মতো শহরে যেখানে রাজনৈতিক চিত্রাঙ্কন স্থানীয় রাজনীতির পরিচয় বহন করে, সেখানে এর ওপর কারচুপির ঘটনা সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক সচেতনতা ও অংশগ্রহণকে প্রভাবিত করে।
এছাড়া, নগর সৌন্দর্য ও পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা নাগরিকদের দৈনন্দিন জীবনে গুরুত্বপূর্ণ। অবৈধ গ্রাফিতি মুছতে চুনকাম করা হলে, তা নগর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অংশ হিসেবে দেখা যেতে পারে। তবে যখন একই সাথে রাজনৈতিক প্রতীক ধ্বংসের অভিযোগ ওঠে, তখন তা রাজনৈতিক উত্তেজনা সৃষ্টি করে, যা সামাজিক স্থিতিশীলতাকে প্রভাবিত করতে পারে।
পটভূমি: বর্ধমান ও পশ্চিমবঙ্গ রাজনীতির মঞ্চ
বর্ধমান, পশ্চিমবঙ্গের একটি ঐতিহাসিক শহর, যা সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। শহরটি দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতির ক্ষেত্রে তৃণমূল কংগ্রেস ও বিজেপির মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতার কেন্দ্রবিন্দু। ২০০০-এর দশকের পর থেকে তৃণমূল কংগ্রেস এই অঞ্চলে শক্ত অবস্থান গড়ে তুলেছে, তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিজেপি এখানে দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জন করছে।
রাজনৈতিক গ্রাফিতি বা দেওয়াল চিত্রাঙ্কন পশ্চিমবঙ্গে প্রচলিত একটি প্রচার মাধ্যম, যা ভোটের মরসুমে রাজনৈতিক দলের উপস্থিতি দৃঢ় করে। এর আগে বিভিন্ন নির্বাচনে এই ধরনের গ্রাফিতি নিয়ে বিতর্ক ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। বিশেষ করে ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের সময় তৃণমূল ও বিজেপির মধ্যে দেওয়ালে রাজনৈতিক প্রতীক নিয়ে সংঘাত লক্ষণীয় ছিল।
তৃণমূল কংগ্রেসের ‘জোড়াফুল’ প্রতীক পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক চিত্রে একটি শক্তিশালী পরিচয় বহন করে। এই প্রতীকটি দলের ঐতিহ্য ও জনমত সংগঠনের প্রতীক হিসেবে কাজ করে। অপরদিকে, বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে নতুন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তাই তারা এই ধরনের প্রতীক ও প্রচার মাধ্যমের ওপর নজর রাখে।
পরবর্তী পদক্ষেপ: রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেও সমাধানের সম্ভাবনা
এই গ্রাফিতি বিতর্ক এখন শুধুমাত্র বর্ধমানের নয়, পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির একটি প্রতীকী ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। সামনের সময়ে রাজনৈতিক দলগুলোকে এই ধরনের ঘটনায় সংযম প্রদর্শন করতে হবে যাতে সামাজিক শান্তি বজায় থাকে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিত নজরদারি ও অবৈধ গ্রাফিতি নির্মূলের উদ্যোগ নেওয়া উচিত, যাতে নগর সৌন্দর্য বজায় থাকে এবং রাজনৈতিক উত্তেজনা কমে।
দ্বিপাক্ষিক আলোচনা ও স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যস্থতায় এই ধরনের ঘটনা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হতে পারে। নাগরিকদেরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে যাতে রাজনৈতিক প্রতীক ও নগর পরিচ্ছন্নতার মধ্যে সঠিক সমন্বয় বজায় থাকে। আগামী নির্বাচনের আগে এই বিতর্ক আরও তীব্র হতে পারে, তাই রাজনৈতিক নেতৃত্বের জন্য দায়িত্বশীল আচরণ অপরিহার্য।
সাংবাদিক দৃষ্টিপাত: রাজনীতির নতুন আঙ্গিকে গ্রাফিতি সমস্যা
বর্ধমানের এই ঘটনা রাজনীতির এক নতুন দিককে সামনে এনেছে যেখানে প্রচারণার মাধ্যম হিসেবে গ্রাফিতি একটি দ্বিমুখী অস্ত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। একদিকে এটি রাজনৈতিক দলের উপস্থিতি ও জনমত তৈরি করে, অন্যদিকে সামাজিক ও প্রশাসনিক সমস্যার জন্ম দেয়। পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে এই ধরনের গ্রাফিতি বিতর্ক নতুন নয়, তবে বর্তমান সময়ে এর গুরুত্ব বেড়েছে কারণ রাজনীতির মঞ্চ আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ও জনমুখী হয়েছে।
তৃণমূল কংগ্রেস ও বিজেপির মধ্যে এই ধরনের সাম্প্রতিক সংঘাত ভবিষ্যতে রাজনীতির ধরণ ও জনসাধারণের রাজনৈতিক অংশগ্রহণের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। তাই এই বিতর্ককে শুধুমাত্র স্থানীয় সমস্যা হিসেবে না দেখে রাজনীতির আধুনিক আঙ্গিক হিসেবে দেখা জরুরি।
সূত্র: Ei Samay


